Read today's news --> ⚡️Click here 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমা অসমের লেডোতে নিষ্ক্রিয় করল সেনাবাহিনী, বিপদ থেকে রক্ষা পেলেন হাজারো বাসিন্দা

৩০ এপ্রিল ২০২৬, অসমের তিনসুকিয়া জেলার লেডো-লেখাপানি এলাকায় একটি জনবহুল স্থান থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমা উদ্ধার করে নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করল ভারতীয় সেনাবাহিনী। ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছে যাওয়া সেনার রেড শিল্ড সেপার্স ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নিয়ে নিরাপত্তার ঘেরাটোপ তৈরি করে বোমাটি একটি নিরাপদ স্থানে নিয়ে গিয়ে নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে ধ্বংস করে। অবিস্ফোরিত বোমাটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ ইঞ্চি এবং ব্যাস প্রায় ৬ ইঞ্চি — যা একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পাওয়া যাওয়ায় জনজীবন ও সম্পত্তির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছিল।

বারবার মাটি ফুঁড়ে উঠছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মৃত্যুফাঁদ

এটি কিন্তু লেডো-লেখাপানি এলাকায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমা পাওয়ার প্রথম ঘটনা নয়। মাত্র এক মাস আগে — ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে — একই এলাকার লেডো বার্মা ক্যাম্পে একটি গর্ত খুঁড়তে গিয়ে একজন সাধারণ নাগরিক দুটি অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ খুঁজে পেয়েছিলেন — একটি সাধারণ উদ্দেশ্যের বোমা (General Purpose bomb) এবং একটি আগুনে বোমা (Incendiary bomb)।সেবারও ভারতীয় সেনার রেড শিল্ড ডিভিশন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিরাপদ ঘেরাটোপ তৈরি করে বোমা দুটি নিষ্ক্রিয় করেছিল। এর মাত্র একদিন আগে — ২৯ এপ্রিল — লেডো পুলিশ আউটপোস্টের অধীনে সিঙ্গরি গ্রামে একটি সন্দেহজনক ট্যাংক শেল উদ্ধার করা হয়েছিল।

এত অল্প সময়ের মধ্যে একের পর এক বোমা উদ্ধারের ঘটনা স্পষ্টভাবে বলছে, উত্তর-পূর্ব অসমের মাটির নিচে আজও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অসংখ্য অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ লুকিয়ে রয়েছে।এই ধরনের অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ আপার অসমে মাঝেমাঝেই মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে — এবং এই অঞ্চল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

লেডো আসামের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অসমের লেডো একটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্র ছিল। ১৯৪২-৪৫ সালে মিত্রশক্তির — বিশেষত মার্কিন ও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর — একটি প্রধান ঘাঁটি হিসেবে এই এলাকা ব্যবহৃত হয়েছিল। বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) পর্যন্ত রসদ পৌঁছে দেওয়ার জন্য নির্মিত বিখ্যাত ‘লেডো রোড’ বা ‘স্টিলওয়েল রোড’ এই এলাকা থেকেই শুরু হয়েছিল — যা ভারত, চীন ও বার্মার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সড়ক হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে।

এই অঞ্চলে সেই যুদ্ধকালীন বিমান হামলা, সামরিক অভিযান এবং অস্ত্র মজুদের যে বিশাল ইতিহাস রয়েছে, তার ফলেই আজও মাটি খুঁড়লে মাঝে মাঝে অবিস্ফোরিত বোমা, শেল বা অন্যান্য গোলাবারুদ পাওয়া যায়। দশকের পর দশক ধরে মাটির নিচে থাকা এই অস্ত্রগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জারিত ও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে — যা যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

সেনাবাহিনীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া যেভাবে বিপদ এড়াল

৩০ এপ্রিলের ঘটনায় বেসামরিক প্রশাসনের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পরপরই ভারতীয় সেনার রেড শিল্ড সেপার্স ইউনিটের বিশেষজ্ঞ বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। সেনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দলটি প্রথমে এলাকার পার্শ্ববর্তী বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেয় এবং একটি নিরাপত্তা ঘেরাটোপ প্রতিষ্ঠা করে। এরপর প্রমাণিত মানসম্পন্ন নিরাপত্তা বিধি মেনে বোমাটি সাবধানে উদ্ধার করে জনবসতির বাইরে একটি নির্ধারিত নিরাপদ স্থানে নিয়ে গিয়ে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণে ধ্বংস করা হয়। গোটা অপারেশনে কোনো হতাহত বা সম্পদের ক্ষতি হয়নি।

IANS সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে মার্চের ঘটনায় সেনা কর্মকর্তাদের বিবৃতি উদ্ধৃত করে বলা হয়, “আমাদের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের সময়মতো পেশাদার প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এনেছে — বেসামরিক মানুষ ও সম্পত্তির কোনো ক্ষতি হয়নি।” এই একই পেশাদারিত্ব ৩০ এপ্রিলের অপারেশনেও পরিলক্ষিত হয়েছে বলে সেনা সূত্র জানিয়েছে।

খনন কাজে সতর্কতার আহ্বান: লালা সহ সারা বরাক উপত্যকায় প্রাসঙ্গিক বার্তা

অসমের আপার অঞ্চলের মতো বরাক উপত্যকাও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সামরিক কার্যক্রমের একটি প্রান্তবর্তী অঞ্চল ছিল। বরাক উপত্যকার লালা, হাইলাকান্দি বা শিলচরের মতো এলাকায় সরাসরি এই ধরনের গোলাবারুদ পাওয়ার ইতিহাস না থাকলেও এই ঘটনা একটি সামগ্রিক সতর্কবার্তা দিচ্ছে। আজকাল সড়ক নির্মাণ, বাড়ি নির্মাণ এবং কৃষি কাজে গভীর মাটি খোঁড়ার কাজ বেড়ে গেছে — এই প্রেক্ষাপটে যেকোনো অস্বাভাবিক বস্তু মাটিতে পেলে অবিলম্বে স্থানীয় প্রশাসন বা পুলিশকে জানানো উচিত। নিজে হাত দেওয়া বা পরীক্ষা করার চেষ্টা করা প্রাণঘাতী হতে পারে।

লেডো-লেখাপানিতে বারবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবিস্ফোরিত বোমা পাওয়া এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর রেড শিল্ড সেপার্স দলের দ্রুত ও নিখুঁত প্রতিক্রিয়া দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সক্ষমতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তবে এই ঘটনাগুলো একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্নও তুলছে — উত্তর-পূর্ব ভারতের মাটিতে এখনও ঠিক কতটা যুদ্ধকালীন অস্ত্র সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ জরিপ হয়েছে কিনা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের ঐতিহাসিকভাবে সংবেদনশীল এলাকায় নিয়মিত ভূ-সমীক্ষা এবং খনন কাজের আগে বিশেষ স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমা অসমের লেডোতে নিষ্ক্রিয় করল সেনাবাহিনী, বিপদ থেকে রক্ষা পেলেন হাজারো বাসিন্দা
Scroll to top