বুদ্ধ পূর্ণিমা ২০২৬ আজ শুক্রবার ১ মে সারা দেশ ও বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে। এই দিনটি বৌদ্ধ ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র উৎসব — কারণ একই দিনে গৌতম বুদ্ধের জন্ম, বোধিলাভ এবং মহাপরিনির্বাণ সংঘটিত হয়েছিল বলে বৌদ্ধ ঐতিহ্য বলে। এই বছর মহামতি গৌতম বুদ্ধের ২৫৮৮তম জন্মজয়ন্তী উদযাপিত হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বুদ্ধের শান্তি, করুণা ও অহিংসার বাণীকে মানবজাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে অভিহিত করেছেন।
পূর্ণিমা তিথি ও পালনের সময়সূচি
বুদ্ধ পূর্ণিমা ২০২৬-এর তিথি শুরু হয়েছে ৩০ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ১৩ মিনিটে এবং শেষ হবে ১ মে শুক্রবার রাত ১০টা ৫২ মিনিটে। হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে উদয় তিথির নিয়মে মূল উপবাস, স্নান ও দানের দিন নির্ধারিত হয় ১ মে শুক্রবার। বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের এই পূর্ণিমাকে বৈশাখী পূর্ণিমা বা বুদ্ধ জয়ন্তীও বলা হয়। বৌদ্ধ ধর্মের ঐতিহ্য অনুযায়ী এই দিনটিকে ‘বেসাক’ বলে ডাকা হয় — এবং আন্তর্জাতিকভাবে এটি Vesak নামে স্বীকৃত। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী এই দিনে স্নান, দান ও পুণ্যকর্ম বিশেষ ফলপ্রসূ বলে মনে করা হয়।
রাষ্ট্রপতি ও PM-এর বার্তায় কী বললেন তাঁরা
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম লিখেছেন, “বুদ্ধ পূর্ণিমার এই শুভ উপলক্ষে বিশ্বের সকল নাগরিক ও ভগবান বুদ্ধের অনুসারীদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানাই।” তিনি আরও বলেন, “এই শুভ উপলক্ষে আসুন আমরা তাঁর আদর্শ গ্রহণ করে একটি শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়সঙ্গত সমাজ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি নিই।”
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বুদ্ধ পূর্ণিমা ২০২৬ উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছেন, “বুদ্ধ পূর্ণিমায় শুভেচ্ছা। ভগবান বুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়নে আমাদের প্রতিশ্রুতি অটুট। তাঁর চিন্তাভাবনা যেন আমাদের সমাজে আনন্দ ও একতার বোধকে গভীরতর করে।” এর আগে এপ্রিলে একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, বিহারের বোধ গয়ায় একটি নতুন আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টার এবং মেডিটেশন ও অভিজ্ঞতা কেন্দ্র স্থাপিত হচ্ছে যা বৌদ্ধ পর্যটন ও তীর্থযাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
কেন এই দিনটি এত বিশেষ — তিনটি অলৌকিক ঘটনার মিলন
বুদ্ধ পূর্ণিমার অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এই একটি দিনই বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুযায়ী তিনটি সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। প্রথমত, খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে বর্তমান নেপালের লুম্বিনীতে সিদ্ধার্থ গৌতম নামে একটি শিশুর জন্ম হয়েছিল — যিনি পরবর্তীতে গৌতম বুদ্ধ নামে সারা বিশ্বে পরিচিত হন। দ্বিতীয়ত, বিহারের বোধ গয়ায় মহাবোধি বৃক্ষের নিচে তাঁর বোধিলাভ বা আলোকপ্রাপ্তি ঘটেছিল। তৃতীয়ত, এই একই তিথিতে তাঁর মহাপরিনির্বাণ বা চূড়ান্ত নির্বাণ লাভের কথাও বৌদ্ধ শাস্ত্রে উল্লেখ আছে। এই তিনটি ঘটনার সমন্বয়ই বৈশাখী পূর্ণিমাকে বৌদ্ধধর্মের সবচেয়ে পবিত্র দিনে পরিণত করেছে।
এই দিনটি শুধু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাই নয়, হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যেও সমান গুরুত্বের সাথে পালিত হয়। হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী গৌতম বুদ্ধ ভগবান বিষ্ণুর নবম অবতার — এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে বৌদ্ধ ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ই এই দিনটি পালন করে থাকেন।
বিশ্বজুড়ে ও অসমে উদযাপন
বোধ গয়ায় এবার ৪০টিরও বেশি দেশের বৌদ্ধ ভিক্ষু ও তীর্থযাত্রীরা একত্রিত হয়েছেন বুদ্ধ পূর্ণিমা পালন করতে। বিশ্বের যে দেশগুলোতে এই দিনটি জাতীয়ভাবে পালিত হয় তার তালিকা দীর্ঘ — ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, তিব্বত, কোরিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, মঙ্গোলিয়া, কম্বোডিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়া।
অসমেও বুদ্ধ পূর্ণিমা ২০২৬ বিশেষ আনুষ্ঠানিকতায় পালিত হচ্ছে। অসম রাজ্যে উল্লেখযোগ্য বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে, বিশেষত রাজ্যের পাহাড়ি জেলাগুলোতে। বরাক উপত্যকায় হাইলাকান্দি ও কাছাড় জেলায় বৌদ্ধ মন্দির ও বিহারগুলোতে এই দিনে বিশেষ পূজা, প্রার্থনা এবং ধর্মীয় আলোচনার আয়োজন করা হয়। লালার মতো বহুধর্মীয় সম্প্রদায়ের জনপদেও এই দিনটি ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে পালিত হয়।
বুদ্ধ পূর্ণিমার বার্তা আজ যত না ধর্মীয়, তত বেশি মানবিক। অহিংসা, করুণা ও সম্যক জীবনযাপনের গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা আজকের পারস্পরিক সংঘাতপূর্ণ বিশ্বে আগের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধানমন্ত্রী — সকলের শুভেচ্ছা বার্তায় যে চিন্তার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে, তা হলো একটি ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিময় সমাজ গড়ার অঙ্গীকার। লালাবাজার.কম বুদ্ধ পূর্ণিমার পবিত্র উপলক্ষে সকল পাঠককে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।