পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর ভোট গণনার ঠিক আগে কলকাতা হাইকোর্ট তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) একটি গুরুত্বপূর্ণ আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। ৩০ এপ্রিল ২০২৬ বুধবার কলকাতা হাইকোর্ট TMC আবেদন খারিজ করে স্পষ্ট করে দিল যে, গণনা কেন্দ্রগুলোতে পর্যবেক্ষক হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের মোতায়েন করার ভারত নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। ২ মে নির্ধারিত ভোট গণনার আগে এই রায় রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট আলোড়ন ফেলেছে।
কেন আদালতে গিয়েছিল TMC
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর ভোট গণনার পর্যবেক্ষক হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের নিয়োগ করার ভারতের নির্বাচন কমিশনের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে TMC আদালতে যায়। তৃণমূল কংগ্রেসের আইনজীবীদের যুক্তি ছিল, কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ কর্মীরা রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারেন এবং তাঁদের গণনা কেন্দ্রে পর্যবেক্ষক হিসেবে রাখা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আদর্শের পরিপন্থী। তাঁরা আদালতকে অনুরোধ করেছিলেন যাতে এই নিয়োগে স্থগিতাদেশ জারি করা হয়। কিন্তু কলকাতা হাইকোর্ট এই আবেদনে কোনো আইনি ভিত্তি খুঁজে না পেয়ে তা সরাসরি খারিজ করে দেয় এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করে।
এই মামলার প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে কিছুটা পেছনে তাকাতে হবে। পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মাঝে এই বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোট গণনায় নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন প্রতিটি গণনা কেন্দ্রে রাজ্যের কর্মীদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের পর্যবেক্ষক হিসেবে মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এই সিদ্ধান্তটিকে TMC কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের অংশ বলে আখ্যা দেয় এবং আদালতে চ্যালেঞ্জ জানায়।
আদালতের রায় ও নির্বাচন কমিশনের অবস্থান
কলকাতা হাইকোর্ট TMC আবেদন খারিজ করে মূলত এই বার্তাই দিল যে, নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক এখতিয়ারের মধ্যে থেকেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারতের সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ নির্বাচন কমিশনকে ভোটের তদারকি, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা দেয় — এবং এর মধ্যে গণনা কেন্দ্রে পর্যবেক্ষক মোতায়েনের অধিকারও অন্তর্ভুক্ত। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কমিশনের এই সিদ্ধান্তে বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
এই রায়ের ফলে ২ মে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটের গণনায় কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীরা পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় থাকবেন এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দেশমাফিক গণনা প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে। ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) সহ বিরোধীরা এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। BJP নেতারা বলছেন, স্বচ্ছ গণনার জন্য এই ব্যবস্থা অপরিহার্য।
পশ্চিমবঙ্গের ভোট রাজনীতি ও বরাক-হাইলাকান্দির প্রাসঙ্গিকতা
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ সরাসরি অসম বা হাইলাকান্দির রাজনীতিকে প্রভাবিত না করলেও, এই নির্বাচনের ফলাফল বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য গভীর মনোযোগের বিষয়। হাইলাকান্দি, কাছাড় ও শ্রীভূমির বিশাল সংখ্যক মানুষ পশ্চিমবঙ্গে পরিবার বা ব্যবসার সূত্রে যুক্ত। রাজনৈতিকভাবেও, পশ্চিমবঙ্গে TMC-র ক্ষমতায় থাকা বা না থাকার প্রভাব সীমান্তবর্তী জেলার ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানে পড়তে পারে। লালা বা হাইলাকান্দির যে পাঠকরা পশ্চিমবঙ্গে পরিবারের সদস্য রেখেছেন বা যোগাযোগ রাখছেন, তাঁদের জন্য এই নির্বাচন ও তার গণনার প্রক্রিয়া বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
কলকাতা হাইকোর্ট TMC আবেদন খারিজ করার রায়টি আরেকটি কারণেও গুরুত্বপূর্ণ — এটি নির্বাচন কমিশনের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে একটি স্পষ্ট বিচারিক অবস্থান তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে যেকোনো রাজ্যে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে এই নজির বিবেচনায় আসবে।
গণনার দিন কী হবে — পরের পদক্ষেপ
২ মে ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের ভোট গণনা শুরু হবে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী প্রতিটি গণনা কেন্দ্রে তিনস্তরের নিরাপত্তা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকবে — কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীরা পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকবেন। কলকাতা হাইকোর্ট TMC আবেদন খারিজ করার পর এই প্রক্রিয়ায় আর কোনো আইনি বাধা নেই। TMC যদি সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, সে সম্ভাবনাও রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হচ্ছে — তবে গণনার আগে সুপ্রিম কোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ মেলার সম্ভাবনা এখন অত্যন্ত সীমিত। ২ মে-র ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ছবি নির্ধারণ করবে — এবং লালাবাজার.কম সেই ফলাফল বরাক উপত্যকার পাঠকদের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছে দেবে।