বরাক উপত্যকায় গৌহাটি হাইকোর্টের একটি স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের দীর্ঘদিনের দাবি নতুন গতি পেয়েছে। ৩০ এপ্রিল ২০২৬ বুধবার দুপুর ১২টায় শিলচরের অরুণ কুমার চন্দ কলেজে হাইকোর্ট বেঞ্চ দাবি বাস্তবায়ন কমিটির কাছাড় জেলা শাখার উদ্যোগে একটি সচেতনতা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রায় ১০০ জন আইন ছাত্রছাত্রী, বিশিষ্ট আইনজীবী এবং সাধারণ নাগরিক অংশ নিয়ে বরাক উপত্যকায় স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চ দাবির পক্ষে সরব হন। এই দাবির পেছনে রয়েছে গৌহাটি হাইকোর্ট থেকে বরাকের প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দূরত্ব এবং বছরের অর্ধেক সময় বন্যা ও ভূমিধসের কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বাস্তবতা।
কী বললেন বক্তারা — ভোগান্তির অনেক চিত্র
সভায় বিস্তারিত উপস্থাপনা দেন সিনিয়র আইনজীবী ধর্মানন্দ দেব, যিনি জানুয়ারি ২০২৬ থেকেই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, গৌহাটি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং অসম সরকারের কাছে লিখিত আবেদন পাঠিয়ে এই দাবি তুলে আসছেন। তিনি বলেন, বরাক উপত্যকার বিচারপ্রার্থীরা — বিশেষত আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষজন — গৌহাটি যাতায়াতে যে বিপুল সময় ও অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হন, তা ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথে একটি বড় বাধা। যোগাযোগব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে মামলা স্থগিত হওয়া বা মুলতবি পড়ার ঘটনাও অহরহ ঘটছে।
সভায় বক্তব্য রাখেন হাইকোর্ট বেঞ্চ দাবি বাস্তবায়ন কমিটির শিলচর শাখার সহ-সভাপতি আইনজীবী শান্তনু নায়েক, যিনি সংবিধানের মূলনীতি এবং সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী পর্যবেক্ষণের আলোকে বিচারব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা বিচারক বিষ্ণু দেবনাথ নিজের দীর্ঘ বিচারিক অভিজ্ঞতার নিরিখে এই দাবির প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানান এবং মামলা নিষ্পত্তিতে সিস্টেমগত বিলম্বের কথা তুলে ধরেন। সিনিয়র আইনজীবী প্রসেনজিৎ কুমার দেব এবং দীপক কুমার দেবও বক্তব্য দেন এবং বলেন যে স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপিত হলে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। সভাটি পরিচালনা করেন আইন শিক্ষার্থী স্নেহাংশু ভট্টাচার্য।
দশকের পুরনো দাবি, বারবার ফিরে আসছে
বরাক উপত্যকায় হাইকোর্ট বেঞ্চের দাবি নতুন নয়। ২০১৪ সালে অসম সরকার বরাক উপত্যকায় একটি বেঞ্চ স্থাপনের বিষয়ে গৌহাটি হাইকোর্টের মতামত চেয়েছিল — কিন্তু সেই প্রস্তাব তখন স্থগিত হয়ে যায়। এরপর দশ বছরেরও বেশি সময় কেটে গেছে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। গৌহাটি হাইকোর্টের মোট মামলার প্রায় ৫০ শতাংশই বরাক উপত্যকা থেকে আসে — অথচ এই বিশাল সংখ্যক মামলার বিচারকাজ পরিচালিত হয় ৩৫০ কিলোমিটার দূরে গুয়াহাটি থেকে।
হাইকোর্ট বেঞ্চ দাবি বাস্তবায়ন কমিটির মার্চ ২০২৬-এর সংবাদ সম্মেলনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বরাক উপত্যকার ৪,০০০-এরও বেশি মামলা গৌহাটি হাইকোর্টে বিচারাধীন। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ রাজ্যসভার সদস্য এস দেব সংসদে এই দাবি তুলে বলেন, “বরাক থেকে গৌহাটি হাইকোর্ট ৩৫০ কিলোমিটার দূরে। বছরে ছয় মাস বন্যা ও ভূমিধসের কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে — এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের পক্ষে সুবিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।” জাসওয়ান্ত সিং কমিটি ১৯৮১ সালে যেসব মানদণ্ড নির্ধারণ করেছিল — দীর্ঘ দূরত্ব, মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি — তার সবটাই বরাক উপত্যকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে দাবিকারীরা বারবার উল্লেখ করছেন।
দেশের দৃষ্টান্ত সামনে রেখে দাবির যুক্তি
বরাকের আইনজীবী মহল বারবার বলছেন, তাদের দাবি অভূতপূর্ব নয়। মাদুরাই (মাদ্রাজ হাইকোর্ট), জয়পুর (রাজস্থান হাইকোর্ট), শিলিগুড়ি (কলকাতা হাইকোর্ট) এবং হুব্বাল্লি (কর্ণাটক হাইকোর্ট) — এই চারটি স্থানেই প্রধান আসন থেকে দূরে সফলভাবে হাইকোর্ট বেঞ্চ পরিচালিত হচ্ছে। আইনজীবী ধর্মানন্দ দেব উল্লেখ করেছেন, এই বিকেন্দ্রীভূত বেঞ্চগুলো মামলার জট কমাতে, বিচারপ্রার্থীদের ব্যয় হ্রাস করতে এবং বিচারব্যবস্থায় জনগণের আস্থা বাড়াতে সহায়তা করেছে। জানুয়ারি ২০২৬-এ ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি মেমোরিয়াল স্বার্থ সুরক্ষা পরিষদও এই দাবিতে স্মারকলিপি দিয়ে বলেছে, অসম সরকার শিলচরে মিনি সচিবালয় স্থাপন করে বিকেন্দ্রীকরণের পথে হাঁটছে — তাহলে বিচারবিভাগীয় বিকেন্দ্রীকরণেও একই যুক্তি প্রযোজ্য।
লালা ও হাইলাকান্দির বাসিন্দাদের কাছে এই দাবির মানে
বরাক উপত্যকায় স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চ দাবির সঙ্গে হাইলাকান্দি জেলার — বিশেষত লালা এলাকার — মানুষের সরাসরি স্বার্থ জড়িত। কাছাড়, শ্রীভূমি ও হাইলাকান্দি — এই তিন জেলা নিয়ে বরাক উপত্যকা গঠিত। হাইলাকান্দি থেকে গৌহাটি হাইকোর্টে যাওয়া মানে দীর্ঘ যাত্রা, বিপুল ব্যয় এবং অনিশ্চয়তা। যদি শিলচরে একটি স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপিত হয়, তাহলে লালার কোনো সাধারণ মানুষকে হাইকোর্টের মামলায় আর গুয়াহাটি যেতে হবে না — শিলচরেই বিচার মিলবে। এই পরিবর্তন শুধু আইনজীবীদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিকে সত্যিকার অর্থে সহজলভ্য করে তুলবে।
৩০ এপ্রিলের সচেতনতা সভা এই দাবির প্রতি ছাত্রসমাজের সমর্থন নিশ্চিত করল — যা আন্দোলনকে শুধু আইন পেশাদারদের গণ্ডি থেকে বের করে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। হাইকোর্ট বেঞ্চ দাবি বাস্তবায়ন কমিটি ইতিমধ্যে বৃহত্তর গণআন্দোলনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এপ্রিল ২০২৬-এ কমিটি রাজ্য ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নতুন স্মারকলিপিও পাঠিয়েছে। বরাক উপত্যকার মানুষের দশকের পুরনো এই দাবি এখন একটি সংগঠিত আন্দোলনের রূপ নিচ্ছে — এবং লালাবাজার.কম এই আন্দোলনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।