মণিপুরের চূড়াচাঁদপুর জেলায় তুইভাই নদীর উপর থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বেইলি ব্রিজ ৩০ এপ্রিল ২০২৬ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হঠাৎ ভেঙে পড়েছে। তুইভাই নদীর সেতু ধস-এর ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও চূড়াচাঁদপুরের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের বাকি অঞ্চলের — বিশেষত অসমের শিলচর ও মিজোরামের সঙ্গে — একটি জরুরি সরবরাহ রুট হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে। সেতুটির পতন ঘটে সিমেন্ট বোঝাই দুটি ট্রাক পার হওয়ার সময় — এবং দুটি যানবাহনই সেতুর সঙ্গে নদীতে পড়ে যায় বলে জানা গেছে।
ঘটনাস্থল ও ক্ষতির বিবরণ
ভেঙে পড়া বেইলি ব্রিজটি ন্যাশনাল হাইওয়ে 102B-তে অবস্থিত ছিল — চূড়াচাঁদপুরের থানলন এলাকার সিনজোয়ল এবং খুয়াংগিন গ্রামের মাঝে। সেতুটি চূড়াচাঁদপুর শহর থেকে সড়কপথে প্রায় তিন ঘণ্টারও বেশি দূরে খুয়াংগিন এলাকার কাছে অবস্থিত ছিল। চূড়াচাঁদপুরের ডেপুটি কমিশনারের দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ব্রিজটি ধসে পড়ার পর সেই সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফুটেজে দেখা গেছে,সেতুর একটি বড় অংশ নদীতে ডুবে রয়েছে এবং দুটি ট্রাক বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে — তবে সৌভাগ্যক্রমে চালক ও সহকারীরা আগেই নিরাপদে সরে যেতে পেরেছিলেন।
এই তুইভাই নদীর সেতু ধস শুধু স্থানীয় এক দুর্ঘটনা নয় — মণিপুর ও মিজোরামের মধ্যবর্তী পাহাড়ি যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু পার্বত্য জেলায় এখনও মূল যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এই ধরনের বেইলি ব্রিজ — যা সাময়িক কাঠামো হিসেবে তৈরি হলেও দশকের পর দশক ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে।
শিলচর-চূড়াচাঁদপুর-মিজোরাম করিডোর: কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ
ধসে পড়া NH 102B সংলগ্ন বেইলি ব্রিজটি ছিল চূড়াচাঁদপুরে নিত্যপণ্য সরবরাহের মূল ধমনী। এই রুটটি অসমের শিলচর থেকে এবং মিজোরামের পথে চূড়াচাঁদপুরে প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়। চাল, ডাল, সিমেন্ট, ওষুধ সহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বড় অংশ এই রুটেই আসে। সেতু ভেঙে যাওয়ায় এখন ওই পণ্যবাহী যানবাহনগুলোকে বিকল্প পথে চলতে হবে — যা দীর্ঘতর এবং সময়সাপেক্ষ।
চূড়াচাঁদপুরের DC অফিসের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “যানবাহনগুলোকে সাময়িকভাবে সিনজোয়ল–ডায়ালখাই–চূড়াচাঁদপুর রুটে NH-02-এর মাধ্যমে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যাত্রীদের এই বিকল্প রুট ব্যবহার করতে এবং কর্তৃপক্ষের জারি করা ট্রাফিক পরামর্শ মেনে চলতে অনুরোধ করা হচ্ছে।” এই বিকল্প পথটি দীর্ঘতর হওয়ায় জ্বালানি খরচ বাড়বে এবং পণ্যের দামেও পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু: NHIDCL মাঠে
সেতু ধসের সংবাদ পাওয়ার পরই চূড়াচাঁদপুর জেলা প্রশাসন ন্যাশনাল হাইওয়েজ অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড (NHIDCL)-কে যুদ্ধকালীন ভিত্তিতে সেতু পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছে। DC অফিস নিশ্চিত করেছে যে NHIDCL ইতিমধ্যে একটি প্রতিস্থাপন বেইলি ব্রিজের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ ও স্থাপনের ব্যবস্থা শুরু করে দিয়েছে। DC অফিসের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “স্বাভাবিক যানচলাচল দ্রুত পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে পুনর্নির্মাণ কাজ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে পরিচালনা করা হচ্ছে।” যত দ্রুত সম্ভব সংযোগ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে।
অসম ও বরাক উপত্যকার সঙ্গে যোগসূত্র
এই ঘটনাটি শুধু মণিপুরের নয়, বরাক উপত্যকার জন্যও সরাসরি প্রাসঙ্গিক। শিলচর উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে চূড়াচাঁদপুর ও মণিপুরের বিভিন্ন জেলায় নিত্যপণ্য সরবরাহ করে থাকে। NH 102B-তে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় শিলচর থেকে চূড়াচাঁদপুরমুখী পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। হাইলাকান্দি ও লালার ব্যবসায়ীরা যাঁরা চূড়াচাঁদপুর বা মিজোরামের বাজারের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের জন্য এটি একটি সতর্কসংকেত — কারণ বিকল্প রুটে পরিবহনের বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে প্রতিফলিত হতে পারে।
উত্তর-পূর্ব ভারতের পার্বত্য অঞ্চলে এই ধরনের অবকাঠামো বিপর্যয় নতুন নয়। একই এলাকায় ২০২২ সালেও একটি বেইলি ব্রিজ ধসে পড়েছিল, যা মণিপুরকে মিজোরামের সঙ্গে সংযুক্ত করত। বারবার ঘটে চলা এই ঘটনাগুলো একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলছে — কতদিন সাময়িক বেইলি ব্রিজের উপর নির্ভর করে পার্বত্য উত্তর-পূর্ব ভারতের সংযোগ বজায় রাখা হবে? স্থায়ী কংক্রিট ব্রিজ নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত এই জেলাগুলোর বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা প্রতিবার ভারী বর্ষা বা যানবাহনের চাপে এই ঝুঁকি বহন করতে থাকবেন। NHIDCL কতদিনের মধ্যে বিকল্প বেইলি ব্রিজ বসাতে পারে এবং স্বাভাবিক যানচলাচল কবে শুরু হবে — সেটাই এখন হাজার হাজার মানুষের মূল প্রশ্ন।