অসমের কাছাড় জেলার শিলচরে একটি মর্মান্তিক ঘটনায় সাত মাসের গর্ভবতী রাবিয়া বেগম (২৬)-এর মৃত্যু হয়েছে — এবং শিলচর সদর থানায় পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর স্বামী বেরু মিয়া লস্কর (২৮)-কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শিলচর গর্ভবতী স্ত্রী মৃত্যু এবং স্বামীর গ্রেপ্তারের এই ঘটনাটি ঘটেছে ২৮ এপ্রিল ২০২৬ রাতে, এবং পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ — রাবিয়াকে হত্যা করা হয়েছে। মৃতদেহে গলায় দড়ির দাগ দেখতে পেয়েছেন পরিবারের সদস্যরা এবং শরীরেও মারধরের চিহ্ন রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, যদিও তদন্তাধীন অবস্থায় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। অভিযুক্ত স্বামী অবশ্য হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ঘটনার পূর্ণ বিবরণ: সোমবার রাতের ফোন থেকে মৃতদেহ পর্যন্ত
Hindustan Times-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাবিয়া ও বেরু মিয়া জিরিঘাটের দিঘালি এলাকার বাসিন্দা এবং মাধুরবন্দ এলাকায় একটি ভাড়াবাড়িতে থাকতেন। প্রায় ছয় বছরের বিবাহিত জীবনে তাঁদের দুটি সন্তান রয়েছে এবং রাবিয়া তৃতীয়বার সন্তানসম্ভবা ছিলেন — সাত মাসের গর্ভে।
ঘটনার রাতে, অর্থাৎ সোমবার (২৮ এপ্রিল), বেরু নিজেই রাবিয়ার পরিবারকে ফোন করে জানান যে রাবিয়াকে শিলচর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে (SMCH) ভর্তি করা হয়েছে এবং তাঁর অবস্থা সংকটজনক। পরিবারের সদস্যরা SMCH-তে ছুটে গেলে জানতে পারেন রাবিয়া ইতিমধ্যে মারা গেছেন। সেখানেই তাঁরা মৃতদেহে গলায় দড়ির দাগ এবং শরীরে মারধরের চিহ্ন লক্ষ করেন।
রাবিয়ার চাচাতো ভাই রমিজ উদ্দিন বলেন, “আমরা SMCH-তে পৌঁছে দেখি সে আর নেই। তার গলায় দড়ির দাগ ছিল, মনে হচ্ছিল শ্বাসরোধ করে মারা হয়েছে। পেটেও লাথি মারা হয়েছিল।” তিনি আরও যোগ করেন, “বেরু আগেও বহুবার তাকে নির্যাতন করত। সে বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিল, কিন্তু আমরা প্রতিবারই তাকে ফিরে যেতে রাজি করিয়েছি। এবার সীমা ছাড়িয়ে গেল — আর সে নির্দোষের ভান করছে।”
অভিযুক্তের বক্তব্য ও পুলিশের তদন্ত
বেরু মিয়া লস্কর জেলা আদালত চত্বরে সাংবাদিকদের বলেছেন যে পরকীয়া সম্পর্কে তাঁর স্ত্রী জানতেন এবং এই কারণেই বিবাদ হয়েছিল, কিন্তু হত্যার অভিযোগ তিনি সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেন। “পরকীয়া ছিল, এটা সত্য। কিন্তু আমি তাকে হত্যা করিনি। সে নিজেই দড়িতে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে,” বেরু বলেন। তাঁর দাবি, ঘটনার সময় তিনি বাড়িতে ছিলেন না।
তদন্তকারী অফিসার জুনু রঞ্জন দেওরি বলেছেন, “২৮ এপ্রিল ভোররাতে শিলচর সদর থানায় রাবিয়ার পরিবার FIR দায়ের করেন। সেই ভিত্তিতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ১০৩(১) ধারা সহ একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।” ২৮ এপ্রিল আটক করে পরে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয় বেরু মিয়াকে এবং আদালত দুইদিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেছে।
তদন্তকারী অফিসার আরও জানান যে ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে — এর মধ্যে রাবিয়ার পাঠানো একটি অডিও ক্লিপও রয়েছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে এবং তদন্তের গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী অতিরিক্ত ধারা যুক্ত হতে পারে। তদন্তকারী অফিসার বলেন, “প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ দেখে মনে হচ্ছে হত্যাকাণ্ড। যদি তা নাও হয়, তাহলে এটি culpable homicide-এর পর্যায়ে পড়বে — যা চার্জশিটে প্রতিফলিত হবে।”
বরাক উপত্যকায় নারীর প্রতি সহিংসতা: একটি বড় প্রশ্ন
শিলচর গর্ভবতী স্ত্রী মৃত্যু-র এই মামলাটি বরাক উপত্যকায় পারিবারিক সহিংসতার একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা প্রতিফলিত করছে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এই অঞ্চলে একাধিক স্ত্রী-হত্যার মামলা সামনে এসেছে — ২০২৫ সালের জুনে ধলাই থানার পানিভরা এলাকায় স্ত্রী হত্যার অভিযোগে স্বামীকে আদালতে পেশ করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের অগাস্টে কাছাড়ের মঙ্গলপুর গ্রামে ঘুমন্ত অবস্থায় আরজিনা বেগমকে দা দিয়ে হত্যার ঘটনাও সামনে এসেছে।
হাইলাকান্দি ও লালার মতো বরাক উপত্যকার ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলেও পারিবারিক বিরোধ এবং নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই নির্যাতিত নারীরা পারিবারিক চাপ ও সামাজিক কারণে সহিংসতার কথা পুলিশে জানাতে সাহস পান না — ঠিক যেমনটা রমিজ উদ্দিনের কথায় স্পষ্ট যে রাবিয়া বারবার নির্যাতিত হয়েছেন এবং পরিবারও তাঁকে বাড়ি ফিরে যেতে রাজি করিয়ে দিয়েছে। এই ধরনের মামলায় পরিবারের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি এবং সামাজিক সচেতনতার অভাব একটি গভীর সমস্যার দিকে আঙুল তোলে।
বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠবে। রাবিয়ার গলায় দড়ির দাগ এবং পেটে আঘাতের পারিবারিক বিবরণ যদি ময়নাতদন্তে প্রমাণিত হয়, তাহলে BNS ১০৩(১) ধারায় হত্যার অভিযোগ আরও শক্তিশালী হবে। অন্যদিকে, পুলিশ যে অডিও ক্লিপটি সংগ্রহ করেছে সেটির বিশ্লেষণও তদন্তের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করবে। বেরু মিয়া লস্কর দুইদিনের পুলিশ রিমান্ডে আছেন এবং এই সময়ের জিজ্ঞাসাবাদ তদন্তে নতুন তথ্য আনতে পারে।
রাবিয়া বেগমের মৃত্যু কেবল একটি পারিবারিক মামলা নয় — এটি গর্ভবতী নারীর নিরাপত্তা, পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষার কার্যকারিতা এবং নির্যাতিত নারীদের পাশে দাঁড়ানোর প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিচার প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক — এটাই এখন পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা।