“রাজনীতি কখনও আমার পরিকল্পনায় ছিল না — ভাগ্যই আমাকে এখানে এনেছে।” আসামের অর্থমন্ত্রী অজন্তা নেওগ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এই কথা বলেছেন। ২০২৬ সালের আসাম বিধানসভা নির্বাচনে গোলাঘাট কেন্দ্র থেকে ৪৩,৭৫৯ ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করে ষষ্ঠবারের মতো বিধায়ক হলেন অজন্তা নেওগ। আসামের প্রথম মহিলা অর্থমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস গড়া এই নেত্রী একইসঙ্গে রাজ্যের দীর্ঘতম-সেবাকারী মহিলা বিধায়কের রেকর্ডও ধরে রেখেছেন — ২০০১ সাল থেকে একটানা জয়ের অসাধারণ ধারা বজায় রেখেছেন তিনি।
স্বামীর মৃত্যু যেদিন রাজনীতির দরজা খুলে দিল
অজন্তা নেওগের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল গভীর ব্যক্তিগত শোকের মধ্য দিয়ে। ১৯৯৬ সালে নিষিদ্ধ সশস্ত্র সংগঠন ULFA তাঁর স্বামী তৎকালীন কংগ্রেস নেতা নাগেন নেওগকে আরও আটজনের সঙ্গে হত্যা করে। সেই বিয়োগান্তক ঘটনার পরেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ তাঁকে রাজনীতিতে আসার অনুরোধ করেন। Gauhati University থেকে MA, LLB এবং LLM ডিগ্রিধারী এবং হান্ডিকে গার্লস কলেজের প্রাক্তন ছাত্রী অজন্তা তখন গুয়াহাটি হাইকোর্টে আইন পেশায় নিযুক্ত ছিলেন। ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার ও নিরাপত্তার পথ ছেড়ে তিনি রাজনীতির অনিশ্চিত ময়দানে পা রাখেন।
অজন্তা নেওগ জানান, তিনি কখনও রাজনৈতিক নেত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেননি। কিন্তু স্বামীর মৃত্যু এবং তরুণ গগৈর আহ্বান — এই দুটি মিলিয়ে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। তাঁর মা রেবতী দাস নিজেও জালুকবাড়ি কেন্দ্র থেকে আসাম বিধানসভার সদস্য ছিলেন — ফলে রাজনীতি পরিবারের একটি পরিচিত ছায়া ছিল, কিন্তু সেই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত তিনি নিজের ইচ্ছায় নয়, পরিস্থিতির চাপে নিয়েছিলেন।
কংগ্রেস থেকে BJP — পাঁচ দশকের রাজনৈতিক যাত্রায় এক বিশাল বাঁক
২০০১ সালে প্রথম নির্বাচনেই কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে গোলাঘাট থেকে ৫৫.১ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন অজন্তা নেওগ। এরপর ২০০৬, ২০১১ ও ২০১৬ সালেও তিনি একই কেন্দ্র থেকে জয় পান। তরুণ গগৈর কংগ্রেস সরকারে তিনি PWD (রোড ও বিল্ডিং), নগর উন্নয়ন ও আবাসন দপ্তরের ক্যাবিনেট মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে তিনি কংগ্রেস ছেড়ে BJP-তে যোগ দেন — রাজনীতির মাঠে একটি সাহসী ও বিতর্কিত পদক্ষেপ। অনেকে সেই সিদ্ধান্তকে সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু ২০২১ সালের নির্বাচনে BJP-র প্রার্থী হিসেবে তিনি আবারও গোলাঘাট থেকে ৯,৩২৫ ভোটের ব্যবধানে জয় পান। নির্বাচনের পরে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা তাঁকে অর্থ ও সমাজকল্যাণ দপ্তরের ভার দেন — আসামের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন মহিলার হাতে যায় অর্থ বিভাগ।
২০২৬ সালের নির্বাচনে অজন্তা নেওগ আরও চমকপ্রদ পারফরম্যান্স দেখান। কংগ্রেসের বিতুপন সাইকিয়াকে ৪৩,৭৫৯ ভোটের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে ষষ্ঠবার বিধায়ক হন। এই জয়ে তিনি আসামের দীর্ঘতম-সেবাকারী মহিলা বিধায়কের রেকর্ড পাকাপাকি করে ফেলেন।
অর্থমন্ত্রী হিসেবে কাজ — আসামের ১৬.৯৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা
অর্থমন্ত্রী হিসেবে অজন্তা নেওগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রমাণ করা যে আইনের ছাত্রী হিসেবে তিনি রাজ্যের অর্থনীতি সামলাতে পারবেন। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ সালের ভোট-অন-অ্যাকাউন্ট বিধানসভায় উপস্থাপন করার সময় তিনি ঘোষণা করেন যে আসাম আগামী অর্থবছরে ১৬.৯৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চলেছে। এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা উত্তর-পূর্বের যেকোনো রাজ্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্য।
তাঁর অর্থমন্ত্রীত্বের মেয়াদে আসামের বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্প — মহিলা ও শিশু উন্নয়নে বিনিয়োগ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ — একটি ইতিবাচক গতি পেয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ আছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় তথ্যমতে, তিনি মহিলা ক্ষমতায়ন এবং জনগণের আস্থার কথা উল্লেখ করে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন, “BJP ২০২১-এর চেয়ে বেশি আসন পাবে।”
বরাক উপত্যকার প্রেক্ষাপটে এই জয়ের তাৎপর্য
অজন্তা নেওগের যাত্রা হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার রাজনীতির জন্যও একটি প্রাসঙ্গিক দর্পণ। একজন সাধারণ পেশাদার মহিলা — যিনি আইনজীবী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন — তাঁর ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের পরেও রাজনৈতিক সংগ্রামে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার গল্প এই অঞ্চলের মহিলা রাজনীতিকদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। বরাক উপত্যকায় নারী নেতৃত্ব এখনও সীমিত — হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ ও কাছাড় জেলায় মহিলা বিধায়ক ও প্রশাসকের সংখ্যা জনসংখ্যার অনুপাতে অনেক কম। অজন্তা নেওগের উদাহরণ দেখিয়ে দেয়, সংসদীয় রাজনীতিতে দলনির্বিশেষে মহিলাদের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি সম্ভব।
আসামের নতুন বিধানসভায় হিমন্ত সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে অজন্তা নেওগ ফের অর্থমন্ত্রীর পদে থাকবেন কিনা, নাকি অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাবেন — সেটা দেখার অপেক্ষা। কিন্তু ২৫ বছরের অজেয় যাত্রা, আসামের প্রথম মহিলা অর্থমন্ত্রীর ইতিহাস এবং শোক থেকে শাসনে ফেরার অসাধারণ গল্প নিয়ে অজন্তা নেওগ আসামের রাজনীতির এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবেন।