Read today's news --> ⚡️Click here 

ভারতে চিনি রফতানি নিষেধাজ্ঞা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত — DGFT-র নির্দেশে দেশীয় বাজার রক্ষার পদক্ষেপ

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট ও দেশীয় উৎপাদনে ঘাটতির আশঙ্কায় ভারত সরকার ১৩ মে ২০২৬ থেকে কার্যকর একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে — কাঁচা চিনি, সাদা চিনি ও পরিশোধিত চিনির রফতানিতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ফরেন ট্রেড (DGFT) বুধবার একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে এই নিষেধাজ্ঞার কথা জানায় এবং বলা হয় এটি ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অথবা পরবর্তী আদেশ না আসা পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। ভারতে চিনি রফতানি নিষেধাজ্ঞার এই সিদ্ধান্তকে  আন্তর্জাতিক চিনি বাজারে একটি বড় আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে।

কেন এই নিষেধাজ্ঞা — উৎপাদন ঘাটতি মূল্যস্ফীতির চাপ

DGFT-র বিজ্ঞপ্তিতে চিনির ITC (HS) কোড ১৭০১ ১৪ ৯০ এবং ১৭০১ ৯৯ ৯০-এর অধীনে রফতানি নীতি ‘সীমাবদ্ধ’ (Restricted) থেকে ‘নিষিদ্ধ’ (Prohibited)-তে পরিবর্তন করা হয়েছে। চিনি রফতানি নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ হিসেবে ২০২৫-২৬ মৌসুমে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো চিনি উৎপাদন দেশীয় চাহিদার চেয়ে কম থাকবে। প্রধান আখ উৎপাদনকারী অঞ্চলে আখের ফলন দুর্বল হওয়ায় সরবরাহ ইতিমধ্যে চাপে আছে।

চলতি অক্টোবর-সেপ্টেম্বর মৌসুমে সরকার ১৫.৯ লক্ষ মেট্রিক টন (MT) চিনি রফতানির অনুমতি দিয়েছিল — যার মধ্যে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত মাত্র ৫.৩ লক্ষ MT জাহাজে উঠেছে। শিল্প সূত্রের মতে, মোট চুক্তি ধরলে প্রায় ১০ লক্ষ MT পাঠানো হত, কিন্তু নিষেধাজ্ঞার ফলে প্রায় ২ লক্ষ MT চিনি দেশের ভেতরে থেকে যাবে। এই মজুত দেশীয় মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করবে বলে সরকার আশা করছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় চিনির মূল্য আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। এই পরিস্থিতিতে রফতানির চাপ বাড়লে দেশীয় বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার ও দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল — সেই ঝুঁকি এড়াতেই এই পদক্ষেপ।

কোন রফতানি চলবে, কোনটা বন্ধ — নিয়মের বিস্তারিত

নিষেধাজ্ঞাটি সম্পূর্ণ সর্বজনীন নয় — DGFT-র বিজ্ঞপ্তিতে বেশ কিছু ব্যতিক্রম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে (EU) CXL কোটা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে (USA) TRQ কোটার অধীনে পাঠানো রফতানি চালু থাকবে। এডভান্স অথরাইজেশন স্কিম (AAS)-এর আওতায় রফতানিও বাধার মুখে পড়বে না।

পাশাপাশি, সরকার-থেকে-সরকার চুক্তির আওতায় অন্য দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় চিনিও পাঠানো যাবে। DGFT-র বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “ভারত সরকারের অনুমতির ভিত্তিতে অন্য দেশের সরকারের অনুরোধ অনুযায়ী তাদের খাদ্য নিরাপত্তার চাহিদা পূরণের জন্য চিনি রফতানির অনুমতি দেওয়া হবে।” এর বাইরে, যে সব পণ্য ইতিমধ্যে বন্দরে পৌঁছে গিয়েছে বা কাস্টমসে হস্তান্তর হয়ে গেছে, সেগুলোও নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবে। Open The Magazine ও DGFT বিজ্ঞপ্তি নিশ্চিত করেছে, ৩০ সেপ্টেম্বরের পর বাড়ানো না হলে নীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘সীমাবদ্ধ’ অবস্থায় ফিরে যাবে।

বিশ্ব বাজারে প্রভাব — নিউইয়র্কে ২%, লন্ডনে ৩% দাম বাড়ল

ভারতের নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার পরপরই নিউইয়র্কের আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচা চিনির ফিউচার মূল্য ২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়, এবং লন্ডনের বাজারে সাদা চিনির ফিউচার মূল্য ৩ শতাংশ লাফ দেয়। ব্রাজিল ও থাইল্যান্ড — ভারতের প্রধান প্রতিযোগী রফতানিকারক দেশ দুটি — এই শূন্যতা পূরণের সুযোগ পাবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। মুম্বাইয়ের একটি বৈশ্বিক বাণিজ্য সংস্থার ডিলার বলেছেন, “ব্যবসায়ীদের জন্য এখন বিদ্যমান রফতানি চুক্তি পূরণ করাটা একটা বড় মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

ভারত ব্রাজিলের পরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চিনি রফতানিকারক দেশ। ২০২২-২৩ মৌসুমে ভারত ১ কোটি ১০ লক্ষ MT-রও বেশি চিনি রফতানি করে রেকর্ড গড়েছিল — সেই তুলনায় চলতি মৌসুমের ১৫.৯ লক্ষ MT অনুমোদনই ছিল অনেক কম। এই নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষত এশিয়া ও আফ্রিকার ক্রেতাদের জন্য।

হাইলাকান্দি আসামের প্রাসঙ্গিকতা — চিনির দাম আখ চাষির ভবিষ্যৎ

ভারতে চিনি রফতানি নিষেধাজ্ঞার প্রত্যক্ষ প্রভাব আসামেও পড়বে। রাজ্যে চিনির ভোক্তামূল্য স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা আছে — কারণ দেশীয় সরবরাহ বাড়লে খুচরা বাজারে দাম বৃদ্ধির চাপ কমবে। লালা টাউনসহ হাইলাকান্দি জেলার বাজারে চিনির খুচরা দামে এই সিদ্ধান্তের ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। El Niño-র কারণে আসন্ন বর্ষা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও দেশীয় মজুত ভালো থাকলে মৌসুমী ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

অন্যদিকে, আসামে আখ চাষিদের জন্য পরিস্থিতি মিশ্র। রাজ্যের বরপেটা, নলবাড়ি ও দরং জেলায় সীমিত পরিসরে আখ চাষ হয়। রফতানি কমলে এবং দেশীয় মিলগুলি মজুত ধরে রাখতে বাধ্য হলে মিল থেকে কৃষকের প্রাপ্য মূল্যেও চাপ পড়তে পারে। তবে আসামের তুলনায় মহারাষ্ট্র, উত্তর প্রদেশ ও কর্ণাটকের আখ চাষিদের উপরে এই প্রভাব অনেক বেশি হবে।

সেপ্টেম্বরের পর সরকার এই নিষেধাজ্ঞা বাড়াবে কিনা, সেটা নির্ভর করবে মূলত দুটি বিষয়ের উপর — আসন্ন বর্ষার গতিপ্রকৃতি এবং ২০২৬-২৭ মৌসুমের নতুন আখ উৎপাদনের পূর্বাভাস। এই নিষেধাজ্ঞা “সূক্ষ্মভাবে ভারসাম্যপূর্ণ সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতির কারণে একটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ।” বিশ্ব বাজারে ব্রাজিল ও থাইল্যান্ড যদি সরবরাহ বাড়ায় এবং আন্তর্জাতিক দাম কমে, তাহলে ভারতের রফতানিকারকরা বাড়তি চাপে পড়বেন। তবে দেশের ভেতরে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে এই মুহূর্তে সরকারের বার্তা স্পষ্ট — আপনার পাতের চিনির জোগান নিশ্চিত করাটাই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

ভারতে চিনি রফতানি নিষেধাজ্ঞা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত — DGFT-র নির্দেশে দেশীয় বাজার রক্ষার পদক্ষেপ
Scroll to top