আসাম বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এ BJP-র প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হওয়ার পর থেকে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসছে — দলের “নারীশক্তি” ও মহিলাদের ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি এবং প্রার্থী মনোনয়নের বাস্তবতার মধ্যে ঠিক কতটা ফারাক রয়েছে? বিশেষত কাছাড় জেলার ক্ষেত্রে BJP কাছাড় নারী প্রতিনিধিত্বের ছবিটি একদম শূন্য — কাছাড়ের সবক’টি আসনে দল পুরুষ প্রার্থী মনোনীত করেছে, একটি আসনেও কোনো মহিলা প্রার্থীকে সুযোগ দেওয়া হয়নি। এই পরিপ্রেক্ষিতে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন, দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের “নারীশক্তি” বার্তাটি বরাক উপত্যকায় কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ছে কিনা।
সারা আসামে BJP-র নারী প্রতিনিধিত্ব: সংখ্যায় কী বলছে চিত্র
২০২৬ সালের আসাম বিধানসভা নির্বাচনে BJP মোট ৮৮টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ছয়জন মহিলা — অর্থাৎ মাত্র ৭ শতাংশ। এই ছয়জন হলেন বিরসিং জরুয়া থেকে মাধবী দাস, চামারিয়া থেকে জ্যোৎস্না কলিতা, মঙ্গলদাই থেকে নীলিমা দেবী, গোলাঘাট থেকে অজন্তা নিওগ, দিফু থেকে নিসো তেরাংপি এবং হাফলং থেকে রূপালী লাংথাসা। লক্ষণীয়ভাবে, এই ছয়জনের একজনও বরাক উপত্যকা — অর্থাৎ কাছাড়, করিমগঞ্জ বা হাইলাকান্দি — থেকে নন।
২০২১ সালে BJP সাতজন মহিলা প্রার্থী দিয়েছিল, তার মধ্যে দু’জন জিতেছিলেন। ২০১৬ সালে ছয়জন। সংখ্যাটি পাঁচ বছরে মাত্র এক বাড়াবাড়া হয়েছে, আবার এবার এক কমে গেছে। CM হিমন্ত বিশ্ব শর্মা অবশ্য দাবি করেছেন যে ২০২৯ সালের মধ্যে আইন অনুযায়ী মহিলাদের ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ কার্যকর হলে — এবং BJP ১২৬টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে — ৪১ জন মহিলা প্রার্থী থাকবেন। কিন্তু এই মুহূর্তে, ৮৮টি আসনে মাত্র ৬ জন মহিলার মনোনয়ন এই প্রতিশ্রুতিকে কেবল ভবিষ্যতের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
সামগ্রিক নির্বাচনী চিত্র আরও হতাশাজনক। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সব দল মিলিয়ে মোট ৭২২ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৫৯ জন মহিলা — মাত্র ৮ শতাংশ। অথচ আসামে মহিলা ভোটারের সংখ্যা মোট ভোটারের প্রায় ৫০ শতাংশ, এবং ভোটদানের হারে তারা প্রায়ই পুরুষদের ছাড়িয়ে যান। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে, কিন্তু প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে — এই বৈপরীত্যই আসামের নারী রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মূল সমস্যা।
কাছাড়ে পরিবারতন্ত্র: BJP-র নারীশক্তির স্লোগানের বিপরীতে বাস্তব
BJP কাছাড় নারী প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নকে আরও জটিল করে তুলছে কাছাড়ে পরিবারতন্ত্রের গভীর শিকড়। কাছাড় জেলার বেশ কয়েকটি আসনে দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নির্ধারিত হয়ে আসছে। সিলচর আসনে BJP প্রার্থী ডা. রাজদীপ রায়ের ক্ষেত্রেও এই ধারণা প্রযোজ্য। পরিবারতন্ত্রের এই ধারা মহিলা প্রার্থীদের জন্য মনোনয়নের সুযোগকে আরও সংকুচিত করে, কারণ “পরিচিত মুখ” ও “নিরাপদ আসন”-এর রাজনীতিতে নতুন — বিশেষত মহিলা — প্রার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই অগ্রাধিকার পান না।
BJP-র কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতৃত্ব প্রতিনিয়ত “নারীশক্তি”-র কথা বলে — PM নরেন্দ্র মোদীর সরকার নারী সংরক্ষণ বিল পাস করেছে, কেন্দ্রীয় প্রকল্পে মহিলাদের জন্য বিশেষ সুবিধা রয়েছে — কিন্তু প্রার্থী নির্বাচনের সময় সেই “শক্তি” কোথায় যায়, তা নিয়ে প্রশ্ন জমে। বিশেষত বরাক উপত্যকায়, যেখানে সমাজ ঐতিহ্যগতভাবে মহিলাদের পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভূমিকায় দেখলেও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে পিছিয়ে রাখে, সেখানে দলের এই সিদ্ধান্ত প্রশ্নের বাইরে নয়।
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকায় নারী রাজনীতির বাস্তবতা
BJP কাছাড় নারী প্রতিনিধিত্বের এই সংকট শুধু কাছাড়ে নয়, হাইলাকান্দিতেও সমান স্পষ্ট। হাইলাকান্দি জেলার দুটি বিধানসভা আসন — হাইলাকান্দি ও কাটলিছড়া — উভয়তেই BJP পুরুষ প্রার্থী দিয়েছে। লালা আসনটি অন্য একটি আসনের অংশ হিসেবে আসাম রাজ্যের আসন পুনর্গঠনে অন্তর্ভুক্ত। হাইলাকান্দির রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিগত কয়েক দশকে এই জেলা থেকে বিধায়ক হিসেবে কোনো মহিলার নাম নির্বাচিত হওয়ার নজির অত্যন্ত বিরল।
অথচ লালা টাউন সহ হাইলাকান্দির সামাজিক জীবনে মহিলাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। Self Help Group (SHG) পরিচালনা, ASHA কর্মী, আঙ্গনওয়ারি কেন্দ্র পরিচালনা, পঞ্চায়েত পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব — এই সবক্ষেত্রে হাইলাকান্দির মহিলারা সক্রিয় ও দক্ষ। কিন্তু এই দক্ষতা ও অংশগ্রহণ বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থিতায় রূপান্তরিত হচ্ছে না। এর পেছনে যেমন দলীয় কাঠামোর পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব রয়েছে, তেমনি রয়েছে অর্থনৈতিক সম্পদ ও নেটওয়ার্কের অসাম্যও।
নারী সংরক্ষণ বিল ও বাস্তব রাজনীতি: আগামীর পথ কী
২০২৩ সালে কেন্দ্রীয় সংসদে পাস হওয়া নারী সংরক্ষণ বিল (Constitution Amendment Act 128) অনুযায়ী, আগামী Delimitation-এর পর লোকসভা ও বিধানসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষিত হবে। CM হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন, আসামে এই আইন ২০২৯ সালের নির্বাচনে কার্যকর হতে পারে। কিন্তু এই আইন কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত দলগুলো নিজে থেকে কতটা উদ্যোগী হবে — এই প্রশ্নের উত্তর কাছাড় ও হাইলাকান্দির ২০২৬-এর প্রার্থী তালিকাই দিয়ে দিয়েছে।
BJP কাছাড় নারী প্রতিনিধিত্বের এই সংকট আসলে একটি বৃহত্তর প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে আসে — রাজনৈতিক দলগুলো কি শুধু নারী ভোট নেবে, নাকি নারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও দেবে? “নারীশক্তি” কেবল প্রকল্পের সুবিধাভোগী হিসেবে নয়, বরং নীতিনির্ধারক হিসেবেও তাদের স্থান দেওয়া না হলে এই স্লোগান কেবল নির্বাচনী বাগাড়ম্বরেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। বরাক উপত্যকার সচেতন ভোটারদের — বিশেষত মহিলা ভোটারদের — এই প্রশ্নটি ভোট দেওয়ার আগে মনে রাখার যথেষ্ট কারণ আছে।