ভারতে পেট্রোল ও ডিজেলের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এখন “শুধু সময়ের ব্যাপার” — এই সতর্কবার্তা দিলেন স্বয়ং RBI গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা। সুইজারল্যান্ডে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে কেন্দ্রীয় সরকার বা রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলির পক্ষে অনির্দিষ্টকাল ধরে ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের দাম শোষণ করে যাওয়া সম্ভব হবে না।
RBI গভর্নর ঠিক কী বললেন — সঞ্জয় মালহোত্রার সরাসরি বক্তব্য
সঞ্জয় মালহোত্রা সুইজারল্যান্ডের সম্মেলনে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “এই পরিস্থিতি যদি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, তাহলে সরকার কিছুটা মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তাদের উপর চাপিয়ে দেবে — এটি কেবল সময়ের অপেক্ষা।” তিনি আরও জানান, বর্তমানে সরকার আবগারি শুল্ক কমিয়ে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন কোম্পানিগুলিকে বাড়তি খরচ বহন করিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই ব্যবস্থা চিরস্থায়ী নয়।
মালহোত্রা সতর্ক করেছেন যে মুদ্রানীতি সাময়িক সরবরাহ-ধাক্কা সহ্য করতে পারে, কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি যদি স্থায়ী আকার নেয়, তাহলে RBI হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হবে। তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত এই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে “ধীরে ধীরে এবং নমনীয়ভাবে” এগোনো। এপ্রিল ২০২৬-এ RBI তার নীতিগত সুদের হার ৫.২৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে এবং ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ নীতি অনুসরণ করছে।
চার বছরের স্থির দাম ও ক্রমবর্ধমান চাপ — পটভূমি
ভারতে পেট্রোল ও ডিজেলের খুচরা মূল্য ২০২২ সালের এপ্রিলের পর থেকে মূলত অপরিবর্তিত রয়েছে — দিল্লিতে পেট্রোল এখন ৯৪.৭৭ টাকা লিটার এবং ডিজেল ৮৭.৬৭ টাকা লিটার। মুম্বাইতে পেট্রোল ১০৩.৪৯ টাকা ও ডিজেল ৯০.০১ টাকায় অপরিবর্তিত রয়েছে। কিন্তু এই স্থিরতার পেছনে রয়েছে সরকারি ভর্তুকি ও তেল কোম্পানির ক্ষতি।
পরিস্থিতি জটিল হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের ইরান আক্রমণ এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড একসময় ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত ভারতের ক্রুড আমদানি গড়ে ব্যারেল প্রতি ১০২.৪৬ ডলারে পৌঁছেছিল। বাণিজ্যিক LPG-র ১৯ কেজির সিলিন্ডারের দাম ইতিমধ্যে বাড়িয়ে ৯৯৩ টাকা করা হয়েছে, কিন্তু গৃহস্থালি ও যানবাহনের জ্বালানির দাম এখনও স্পর্শ করা হয়নি।
মে ৭ তারিখের একটি প্রতিবেদনে সরকারি সূত্র উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, মে ১৫-এর আগেই পেট্রোল-ডিজেলে লিটারপ্রতি ৪-৫ টাকা এবং ৫-৭ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হর্দীপ সিং পুরি ও বিশিষ্ট শিল্পপতি উদয় কোটকও সাধারণ নাগরিকদের পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন ।
লালা টাউন ও হাইলাকান্দিতে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি হলে এর প্রথম ও সরাসরি প্রভাব পড়বে পরিবহন খরচে। লালা টাউন ও হাইলাকান্দি জেলার সাধারণ মানুষ প্রতিদিনের কাজে — বাজারে যাওয়া, অফিস যাতায়াত, পণ্য পরিবহন — অটোরিকশা, ট্রাক ও ছোট গাড়ির উপর নির্ভরশীল। পেট্রোল বা ডিজেলের দাম লিটারে ৫-৭ টাকা বাড়লে গুয়াহাটি থেকে শিলচর হয়ে হাইলাকান্দি পর্যন্ত পণ্য পরিবহনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বরাক উপত্যকার বেশিরভাগ পণ্য এই দীর্ঘ সড়কপথে আসে — ফলে সবজি, মুদিখানা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ার সরাসরি সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষত লালা বাজারের ব্যবসায়ীরা, যাঁরা শিলচর বা গুয়াহাটি থেকে পণ্য আনেন, তাঁদের মার্জিনে এই বৃদ্ধির চাপ পড়বে।
সামনে কী — সরকারের কৌশল ও সাধারণ মানুষের প্রস্তুতি
মার্চ ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন জানিয়েছিলেন যে ভারতের মুদ্রাস্ফীতি তখনও RBI-এর সহনীয় সীমার নিম্নপ্রান্তে ছিল, তাই তাৎক্ষণিক উদ্বেগের কারণ নেই। RBI-র হিসেব অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে মুদ্রাস্ফীতিতে প্রায় ৩০ বেসিস পয়েন্ট যোগ হতে পারে। কিন্তু ক্রুড যদি ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে দীর্ঘদিন থাকে, তাহলে এই গণনা দ্রুত বদলে যায়।
সাধারণ ভোক্তাদের জন্য বার্তা স্পষ্ট: চার বছরের স্থির জ্বালানি মূল্যের যুগ সম্ভবত শেষ হতে চলেছে। RBI গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রার সতর্কবার্তা ও সরকারি সূত্রের ইঙ্গিত মিলিয়ে দেখলে বোঝা যাচ্ছে, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কেবল আন্তর্জাতিক তেল বাজারের গতিপ্রকৃতির উপর নির্ভর করছে। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি শান্ত না হলে, লালা টাউন থেকে দিল্লি — সারা ভারতের মানুষকেই পাম্পে উচ্চতর মূল্য দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।