গুয়াহাটিতে একটি আধুনিক LPG শ্মশান নির্মাণ করা হয়েছিল কাঠের চিতার বিকল্প হিসেবে — কম খরচে, কম সময়ে এবং পরিবেশের ক্ষতি না করে শেষকৃত্য সম্পন্ন করার লক্ষ্যে। কিন্তু গুয়াহাটি LPG শ্মশান বর্তমানে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে আছে। সুস্পষ্ট আর্থিক ও পরিবেশগত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এই শ্মশানটি চালু রাখা সম্ভব হয়নি — যা প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও জনসচেতনতার অভাবের এক উদ্বেগজনক উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজ্যের পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নে এই অচলাবস্থা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
কাঠ বনাম LPG: খরচ, সময় ও পরিবেশের তুলনামূলক চিত্র
ঐতিহ্যবাহী কাঠের চিতায় একটি মৃতদেহ সম্পূর্ণ দাহ করতে ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি কাঠ প্রয়োজন হয় এবং সময় লাগে চার থেকে ছয় ঘণ্টা। এই প্রক্রিয়ায় পরিবার পিছু খরচ পড়ে ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা। বিপরীতে, LPG শ্মশানে একই কাজ সম্পন্ন হয় মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় এবং সময় লাগে মাত্র দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। ভারতজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ মৃতদেহ দাহ করা হয় এবং এই প্রক্রিয়ায় ৫ থেকে ৬ কোটি গাছ কাটা পড়ে — যা প্রায় ৮০ লক্ষ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে ছেড়ে দেয়। সামাজিক কর্মী বিজয় লিমাইয়ের উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছে, “একটি গাছ ২৫ বছর ধরে কার্বন সংগ্রহ করে — আর দাহে সেই সব কার্বন মাত্র ৯০ মিনিটে বায়ুতে মিশে যায়।”
LPG পদ্ধতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হল ছাইয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম — কারণ শুধু মৃতদেহের ছাই থাকে, কাঠের নয়। ফলে নদীতে বিসর্জন দেওয়ার ছাইয়ের পরিমাণও কমে এবং নদীদূষণ কিছুটা হলেও রোধ হয়। এছাড়া LPG শ্মশান বৃষ্টি বা ঝড়ের মধ্যেও নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পারে — যা খোলা আকাশের চিতায় সম্ভব নয়। এত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও গুয়াহাটি LPG শ্মশান বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা একটি গভীর প্রশ্ন তুলে ধরে।
গৌহাটি হাইকোর্টের নির্দেশ ও রাজ্য সরকারের নিষ্ক্রিয়তা
এই সমস্যা নতুন নয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে গৌহাটি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি আরএম ছায়া ও বিচারপতি সৌমিত্র সাইকিয়ার বেঞ্চ বিজন চক্রবর্তীর দায়ের করা একটি জনস্বার্থ মামলার (PIL) পরিপ্রেক্ষিতে অসম সরকারকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছিল — রাজ্যের সব জেলা সদরে পর্যায়ক্রমে বৈদ্যুতিক বা LPG শ্মশান স্থাপন করতে হবে। হাইকোর্ট তখন পর্যবেক্ষণ করেছিল, “আজকের দিনে যেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ সবচেয়ে জরুরি, সেখানে ঐতিহ্যবাহী দাহ পদ্ধতির বদলে বৈদ্যুতিক বা LPG শ্মশান পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যকেই সমর্থন করবে।”
অর্থাৎ আদালতের নির্দেশের তিন বছর পরেও গুয়াহাটির LPG শ্মশান চালু রাখা সম্ভব হয়নি — এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে আদালতের নির্দেশ কার্যকর করতে রাজ্য প্রশাসনের সদিচ্ছা ও পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। জাতীয় সবুজ আদালত (NGT) ২০১৬ সালেই কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলোকে কাঠের বিকল্প দাহ পদ্ধতি চালুর নির্দেশ দিয়েছিল — যুক্তি ছিল, ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে বিপজ্জনক দূষণকারী পদার্থ বায়ুতে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এক দশক পরেও সেই নির্দেশের বাস্তবায়ন আশানুরূপ নয়।
জনসচেতনতার অভাব ও সামাজিক প্রতিরোধ
শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, LPG বা বৈদ্যুতিক শ্মশান ব্যবহারে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি সামাজিক ও ধর্মীয় দ্বিধাও কাজ করছে। অনেকের ধারণা, কাঠের চিতায় দাহ করাটাই ধর্মসম্মত — অন্য পদ্ধতি মোক্ষ বা মুক্তির পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। সামাজিক কর্মী বিজয় লিমাইয়ের ভাষায়, “এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। হিন্দু ধর্মগ্রন্থে কোথাও শুধু কাঠই ব্যবহার করতে হবে এমন কথা নেই। LPG ব্যবহার করলে ধর্মবিরোধিতা হয় না।” তবুও এই ভুল বিশ্বাস শিকড় গেড়ে বসে আছে এবং নতুন পদ্ধতি গ্রহণে মানুষ দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছেন।
এছাড়া শ্মশান সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার একটি সামাজিক সংকোচও রয়েছে। ফলে এই বিষয়ে জনমত তৈরি করা এবং সচেতনতা প্রচার করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরিবেশ কর্মীরা মনে করছেন, সরকারকে সক্রিয়ভাবে ধর্মীয় নেতৃত্বকে সঙ্গে নিয়ে এই বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে যে আধুনিক শ্মশান পদ্ধতি ধর্মের বিরুদ্ধ নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির প্রাসঙ্গিকতা
গুয়াহাটি LPG শ্মশান বন্ধ থাকার এই সমস্যা বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দি জেলার জন্যও একটি জরুরি পাঠ। হাইলাকান্দি ও লালা শহরে এখনও মূলত কাঠের চিতায় দাহকার্য সম্পন্ন হয়। স্থানীয়ভাবে কাঠের চাহিদা মেটাতে গিয়ে বনের উপর চাপ পড়ছে — বিশেষত বরাক উপত্যকার পার্বত্য অঞ্চলে যেখানে ইতোমধ্যে বন উজাড়ের সমস্যা রয়েছে। গৌহাটি হাইকোর্টের ২০২২ সালের নির্দেশে হাইলাকান্দিসহ সব জেলা সদরে আধুনিক শ্মশান স্থাপনের কথা বলা হয়েছে — কিন্তু এই জেলায় সেই উদ্যোগ কতটুকু এগিয়েছে, তা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য এখনও পাওয়া যায়নি।
গুয়াহাটির এই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। শুধু শ্মশান নির্মাণ করলেই হবে না — সেটি সচল রাখতে দক্ষ জনবল, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। হাইলাকান্দি পৌর কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসন যদি এখন থেকেই পরিকল্পনা শুরু করে, তাহলে ভবিষ্যতে একটি কার্যকর পরিবেশবান্ধব শ্মশান ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
গুয়াহাটির LPG শ্মশানের এই করুণ পরিণতি শুধু একটি শহরের প্রশাসনিক ব্যর্থতার গল্প নয় — এটি গোটা ভারতের একটি বৃহত্তর সমস্যার প্রতিফলন। পরিবেশবান্ধব বিকল্প তৈরি করা হচ্ছে, কিন্তু সেগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক তদারকি ও সামাজিক সচেতনতার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। ভারত জুড়ে প্রতি বছর ৫ থেকে ৬ কোটি গাছ শুধু দাহক্রিয়ায় নষ্ট হচ্ছে — এই সংখ্যাটি না কমলে পরিবেশ রক্ষার যত বড় প্রতিশ্রুতিই দেওয়া হোক, তা অর্থহীন থেকে যাবে।