Read today's news --> ⚡️Click here 

গুয়াহাটি মালিগাঁও মৃত্যুতে ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল তদন্ত: খোলা নালায় তলিয়ে প্রাণ গেল পায়েল নাথের

রবিবার রাতে গুয়াহাটিতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার তীব্র বৃষ্টি একটি পরিবারের জীবনে অন্ধকার নামিয়ে এনেছে। মালিগাঁও চারিয়ালি এলাকায় রাস্তার পাশের একটি খোলা নালায় তলিয়ে গেলেন পায়েল নাথ নামে এক তরুণী। হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় গুয়াহাটি মালিগাঁও মৃত্যুর বিষয়ে কামরূপ মেট্রোপলিটন জেলা প্রশাসন ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। Assam State Disaster Management Authority (ASDMA) নিশ্চিত করেছে যে পায়েল নাথ মালিগাঁও চারিয়ালি এলাকার একটি নর্দমায় পড়ে যান এবং পরবর্তীতে তাঁকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২৫০ মিটার দূরে উদ্ধার করা হয়।

কী ঘটেছিল সেই রাতে: ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি, শহর তলিয়ে গেল

১৯ এপ্রিল সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গুয়াহাটিতে ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর (IMD)-এর তথ্য অনুযায়ী ১০০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। The Northeast Post জানিয়েছে, রেকর্ড করা বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ১২০ মিলিমিটার। এই পরিমাণ বৃষ্টি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শহরের নিকাশি ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অকেজো করে দেয়। ASDMA-র সরকারি বিবৃতিতে উল্লেখিত জলাবদ্ধ এলাকাগুলোর তালিকা দেখলেই পরিস্থিতির ব্যাপকতা স্পষ্ট হয়: রুক্মিণীগাঁও, ঘোরামারা, জুরিপার, পাঞ্জাবাড়ি, হাটিগাঁও, সিজুবাড়ি, সাটগাঁও, জাটিয়া, শওকুচি, অনিল নগর, নবীন নগর, রাজগড়, সরুমটোরিয়া, বরমটোরিয়া, নারেঙ্গি, মালিগাঁও এবং বরাগাঁও — মোট সতেরোটি এলাকা।

মালিগাঁও চারিয়ালির ওই মুহূর্তে রাস্তায় বন্যার জল এবং নালার জল একাকার হয়ে গিয়েছিল। রাস্তা চেনার উপায় ছিল না। সেই পরিস্থিতিতেই পায়েল নাথ খোলা নালায় পড়ে যান। রাতের অন্ধকারে, জলের তোড়ে তিনি ঘটনাস্থল থেকে ২৫০ মিটার ভেসে যান। উদ্ধারকারী দল তাঁকে খুঁজে পেলেও হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল তদন্ত প্রশাসনের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ

গুয়াহাটি মালিগাঁও মৃত্যুর ঘটনায় কামরূপ মেট্রোপলিটন জেলা প্রশাসন ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল তদন্তের আদেশ দিয়েছে। এই তদন্তে দেখা হবে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে — নালাটি কতদিন ধরে উন্মুক্ত ছিল, সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কি না, এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা ছিল কি না। এই তদন্তের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে।

ASDMA এবং দমকল বিভাগ ও রাজ্য দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া দল (SDRF) মিলে মোট প্রায় ৫০ জন বাসিন্দাকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যায়। রুক্মিণীগাঁও, তরুণ নগর, অনিল নগর, লাচিত নগর, ভরলু মুখ সহ একাধিক জায়গায় পাম্প বসিয়ে জল নামানোর কাজ শুরু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলা প্রশাসন GMC এলাকার সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২০ এপ্রিল বন্ধ ঘোষণা করে।

গুয়াহাটির কৃত্রিম বন্যা: দশকের পুরোনো সমস্যার নতুন চেহারা

পায়েল নাথের এই মর্মান্তিক মৃত্যু নিছক একটি দুর্ঘটনা নয় — এটি গুয়াহাটির দীর্ঘদিনের নিকাশি ব্যর্থতার সরাসরি পরিণতি। ২০০৯ সালে গুয়াহাটি মেট্রোপলিটন এলাকার মাস্টার প্ল্যান স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল: “শহরের একটি ছোট অংশ বাদে অন্য কোথাও কোনো পরিকল্পিত নিকাশি ব্যবস্থা বিদ্যমান নেই।” সেই সতর্কতা উপেক্ষা করা হয়েছে, এবং ফলাফল আজ সবার সামনে।

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB)-র মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ভরলু নদী — যা গুয়াহাটির প্রধান নিকাশি চ্যানেল — এখন নগর এলাকায় মাত্র ১০-২০ মিটার চওড়া একটি নর্দমায় পরিণত হয়েছে, যার মধ্যে বৃষ্টির জল, পয়ঃনিষ্কাশন এবং কঠিন বর্জ্য সবই মিশে যায়। ২০২১ সালে Assam State Disaster Management Authority নিজেই সতর্ক করেছিল যে গুয়াহাটি “স্থায়ী নগর বন্যার ঝুঁকিতে” রয়েছে, যদি না অবিলম্বে নিকাশি ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা হয়। সেই সতর্কতা বাস্তবে পরিণত হয়েছে ২০২৬ সালের এপ্রিলের রাতে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হল — গুয়াহাটির জলাবদ্ধতার সমস্যা শুধু শহরের ভেতরের নিকাশি দিয়ে সীমাবদ্ধ নয়। মেঘালয়ের পাহাড় থেকে আসা বাহিনী নদী যখন একই সময়ে বৃষ্টির জল বহন করে শহরে ঢোকে, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে পড়ে। Gauhati High Court ইতিমধ্যে একটি Action Plan দাবি করেছে, এবং ADB বাহিনী বেসিন প্রকল্পে অর্থায়ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল — এই প্রকল্পগুলো বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগে আর কতটা মূল্য দিতে হবে?

বরাক উপত্যকার সতর্কসংকেত: হাইলাকান্দি লালার জন্য শিক্ষা

গুয়াহাটির এই ট্র্যাজেডি বরাক উপত্যকার মানুষের কাছে একটি কঠোর সতর্কসংকেত। হাইলাকান্দি জেলায় — যেখানে লালা টাউনও অবস্থিত — বর্ষা মৌসুমে খোলা নালা, অপরিকল্পিত রাস্তার পাশের ড্রেন, এবং দ্রুত জলাবদ্ধতা একটি পরিচিত সমস্যা। লালা বাজার এলাকায় বর্ষায় রাস্তায় হাঁটু পানি জমে যায় এবং নালাগুলো প্রায়ই উপচে পড়ে — কিন্তু সেগুলোর ওপর ঢাকনা থাকে না বা রাতে পর্যাপ্ত আলো নেই। পায়েল নাথের মৃত্যু প্রমাণ করে, এই অবহেলা যে কোনো সময় প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

হাইলাকান্দি জেলায় প্রতি বছর বন্যা একটি পুনরাবৃত্ত দুর্যোগ। Deccan Herald জানিয়েছে, বরাক উপত্যকায় বন্যায় একাধিক প্রাণহানি ঘটেছে এবং হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। গুয়াহাটির মতো লালা ও হাইলাকান্দিতেও যদি খোলা নালাগুলো ঢাকা দেওয়া না হয়, রাস্তার পাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে একই দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি এখানেও ঘটতে পারে।

গুয়াহাটি মালিগাঁও মৃত্যুর ঘটনায় ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল তদন্ত শুরু হওয়া একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ — কিন্তু এটি যথেষ্ট নয়। তদন্ত যদি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয় এবং দায়ী ব্যক্তি বা সংস্থাকে জবাবদিহি করতে না পারে, তাহলে পায়েল নাথের পরিবারের বিচার অনিশ্চিত থেকে যাবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ, শহরের নিকাশি কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন না এলে আগামী বর্ষায় আবার একই ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যাবে। গুয়াহাটির মানুষ এবং সারা আসামের বাসিন্দারা — গুয়াহাটি থেকে লালা পর্যন্ত — প্রশাসনের কাছে কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় আছেন।

গুয়াহাটি মালিগাঁও মৃত্যুতে ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল তদন্ত: খোলা নালায় তলিয়ে প্রাণ গেল পায়েল নাথের
Scroll to top