প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শুক্রবার থেকে শুরু করেছেন গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ দেশ সফর। ছয় দিনের এই সফরে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়ে এবং ইতালি সফর করবেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা এবং কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করাই এই সফরের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। বিদেশ মন্ত্রকের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে এই সফর ভারতের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও মজবুত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, সফরের প্রথম পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী আবুধাবিতে ইউএই প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করবেন। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে।
মোদীর পাঁচ দেশ সফরে ইউরোপের ওপর বিশেষ গুরুত্ব
এই সফরের বড় অংশ জুড়েই রয়েছে ইউরোপীয় দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা। নেদারল্যান্ডসে প্রধানমন্ত্রী মোদী ডাচ প্রধানমন্ত্রী ডিক শুফের সঙ্গে বৈঠক করবেন। জল ব্যবস্থাপনা, কৃষি প্রযুক্তি এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রের দাবি। নেদারল্যান্ডস বর্তমানে ইউরোপে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার।
এরপর সুইডেন ও নরওয়েতে অনুষ্ঠিতব্য নর্ডিক সম্মেলনে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। এই সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন, সবুজ জ্বালানি, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং আর্কটিক অঞ্চলের সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে চলমান আলোচনার প্রেক্ষাপটে এই বৈঠকগুলি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।
বিদেশ মন্ত্রকের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক জানান, “ভারত এখন শুধু দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি নয়, বরং বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। এই সফরের মাধ্যমে ইউরোপীয় দেশগুলির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে।”
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইতালির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক
মোদীর পাঁচ দেশ সফরের শেষ পর্যায়ে ইতালি সফর বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে তাঁর বৈঠকে প্রতিরক্ষা উৎপাদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং শিল্প বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। গত কয়েক বছরে ভারত-ইতালি সম্পর্ক নতুন গতি পেয়েছে। বিশেষ করে জি-২০ সম্মেলনের পর দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
অন্যদিকে ইউএই সফর ভারতের জন্য অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত লক্ষ লক্ষ ভারতীয় প্রবাসীর স্বার্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগের প্রশ্নে আবুধাবির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা দিল্লির অন্যতম অগ্রাধিকার। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত বর্তমানে ইউএই-র দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে ভারত পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপ—দুই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের সঙ্গে সমান্তরাল কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে চলমান বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার আবহেও ভারত নিজেকে একটি নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
অসম ও বরাক উপত্যকার জন্য কী গুরুত্ব
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সফর হলেও এর প্রভাব উত্তর-পূর্ব ভারত এবং অসমের অর্থনীতিতেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় সরকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবকাঠামো, লজিস্টিক এবং সীমান্ত বাণিজ্য সম্প্রসারণে জোর দিচ্ছে। ইউরোপীয় ও উপসাগরীয় বিনিয়োগ বাড়লে অসমের শিল্প, চা রপ্তানি এবং কৃষি-প্রক্রিয়াকরণ খাত লাভবান হতে পারে।
বরাক উপত্যকার ব্যবসায়ী মহলের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের ফলে শিলচর ও হাইলাকান্দির ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং রপ্তানি ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, বাঁশ শিল্প এবং হস্তশিল্পের মতো ক্ষেত্রে বিদেশি বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা বাড়বে বলে মনে করছেন তাঁরা।
লালা টাউনের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, কেন্দ্রীয় সরকার যদি উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ ও রপ্তানি অবকাঠামো আরও উন্নত করে, তাহলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবেন। যদিও এই ধরনের আন্তর্জাতিক সফরের সরাসরি ফল তৎক্ষণাৎ দেখা যায় না, তবুও বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক চুক্তির প্রভাব ভবিষ্যতে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
ভবিষ্যতের কূটনৈতিক বার্তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, মোদীর পাঁচ দেশ সফর শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ভারতের বৈশ্বিক কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও সক্রিয় করার কৌশলের অংশ। ইউরোপীয় দেশগুলির সঙ্গে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং পরিবেশগত সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করাও এই সফরের মূল উদ্দেশ্য।
আগামী কয়েক দিনে অনুষ্ঠিত বৈঠক ও সম্ভাব্য চুক্তিগুলির দিকে আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকবে। বিশেষ করে বাণিজ্য, সবুজ জ্বালানি এবং প্রযুক্তি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কী নতুন ঘোষণা আসে, সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। ভারতের বৈদেশিক নীতির পরবর্তী দিকনির্দেশও অনেকাংশে এই সফরের ফলাফলের ওপর নির্ভর করতে পারে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।