আসামে ইউনিফর্ম সিভিল কোড নিয়ে আবারও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করলেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। বৃহস্পতিবার এক সরকারি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা UCC কার্যকর হলে দেশের প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও ন্যায়বিচার পাবেন। তাঁর মতে, ধর্মভিত্তিক আলাদা ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তে একক নাগরিক আইন চালু হলে সমাজে আইনি স্বচ্ছতা আরও শক্তিশালী হবে এবং নারী অধিকার রক্ষাও সহজ হবে।
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, আসাম সরকার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, “আইনের চোখে সকল নাগরিকের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করাই আধুনিক গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি।” রাজনৈতিক মহলের মতে, নতুন মেয়াদে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার UCC ইস্যুকে আরও সক্রিয়ভাবে সামনে আনতে পারে।
আসামে ইউনিফর্ম সিভিল কোড নিয়ে কেন বাড়ছে আলোচনা
আসামে ইউনিফর্ম সিভিল কোড নিয়ে বিজেপির অবস্থান দীর্ঘদিনের। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা আগেও বহুবার বলেছেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য এক ধরনের দেওয়ানি আইন থাকা উচিত। তাঁর দাবি, বিবাহ, তালাক, ভরণপোষণ এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলাদা ব্যক্তিগত আইন দীর্ঘমেয়াদে বৈষম্য তৈরি করতে পারে।
সম্প্রতি উত্তরাখণ্ডে UCC কার্যকর করার পদক্ষেপের পর আসামেও এই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সংবিধানের নির্দেশমূলক নীতিতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। কারণ দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রদায়ের নিজস্ব পারিবারিক আইন বহু বছর ধরে প্রচলিত রয়েছে।
হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, “UCC কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। এটি নাগরিকদের সমান অধিকার ও বিচার নিশ্চিত করার সাংবিধানিক উদ্যোগ।” তাঁর বক্তব্য, বিশেষ করে নারীদের আইনি সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনি সংস্কার জরুরি।
সমান নাগরিক অধিকার নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
আসামে ইউনিফর্ম সিভিল কোড প্রসঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও সরব হয়েছে। কংগ্রেস এবং কয়েকটি আঞ্চলিক দলের অভিযোগ, বিজেপি এই ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে। তাঁদের মতে, ভারতের বৈচিত্র্যময় সমাজ কাঠামোকে বিবেচনা না করে একক আইন প্রয়োগের চেষ্টা করলে তা নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
তবে বিজেপির বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা। দলের দাবি, UCC কার্যকর হলে নারী ও শিশুদের অধিকার আরও শক্তিশালী হবে এবং বিচার ব্যবস্থায় বৈষম্য কমবে। কেন্দ্রীয় আইন কমিশনও অতীতে এই বিষয়ে নাগরিকদের মতামত চেয়েছিল। যদিও এখনও জাতীয় স্তরে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, বিভিন্ন রাজ্যে এই নিয়ে আলোচনা ক্রমশ বাড়ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসামে ইউনিফর্ম সিভিল কোড আগামী কয়েক বছরে অন্যতম বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। কারণ বিজেপি উন্নয়নমূলক রাজনীতির পাশাপাশি সাংবিধানিক ও সামাজিক সংস্কারের বিষয়গুলিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দিতে কী প্রভাব পড়তে পারে
বরাক উপত্যকা, বিশেষ করে হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ ও কাছাড় জেলার মতো অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস রয়েছে। ফলে আসামে ইউনিফর্ম সিভিল কোড নিয়ে আলোচনা এই অঞ্চলগুলিতেও গুরুত্ব পাচ্ছে। স্থানীয় আইনজীবী এবং সমাজকর্মীদের একাংশের মতে, UCC কার্যকর হলে বিবাহ, তালাক এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত বহু আইনি প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসতে পারে।
হাইলাকান্দির কয়েকটি সামাজিক সংগঠন ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। তাঁদের মতে, নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষাও সমানভাবে জরুরি। লালা টাউন এলাকাতেও বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভিন্নমত দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং শিক্ষিত তরুণদের একাংশ মনে করছেন, যদি আইনটি স্বচ্ছভাবে এবং সবার মতামত নিয়ে কার্যকর করা হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। তবে অন্য অংশের মতে, এমন সংবেদনশীল বিষয়ে সরকারের আরও বিস্তৃত আলোচনা ও জনমত গ্রহণ প্রয়োজন।
ভবিষ্যতে কোন পথে এগোতে পারে সরকার
বিশেষজ্ঞদের মতে, আসামে ইউনিফর্ম সিভিল কোড নিয়ে আলোচনা এখন শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি প্রশাসনিক ও আইনি স্তরেও গুরুত্ব পাচ্ছে। যদিও সরকার এখনও কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করেনি, তবুও মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্যে স্পষ্ট যে বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে।
আগামী দিনে রাজ্য সরকার যদি এই বিষয়ে কোনও খসড়া নীতি, বিশেষ কমিটি বা জনমত সংগ্রহ প্রক্রিয়া শুরু করে, তাহলে তা জাতীয় স্তরেও বড় রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিতে পারে। একই সঙ্গে বিরোধী দল, সামাজিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, আসামে ইউনিফর্ম সিভিল কোড এখন শুধু একটি রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; বরং এটি নাগরিক অধিকার, সাংবিধানিক সমতা এবং সামাজিক ভারসাম্যের প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে। আগামী দিনে এই ইস্যু আসামের রাজনীতিতে আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।