Read today's news --> ⚡️Click here 

মোদির সুইডেন সফর ২০২৬: গোথেনবার্গে বাণিজ্য, AI ও সবুজ প্রযুক্তিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর পাঁচ দেশের ইউরোপ-উপসাগর সফরের তৃতীয় পর্যায়ে ১৭ মে ২০২৬ রবিবার সুইডেনের গোথেনবার্গ শহরে পৌঁছেছেন। সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসনের আমন্ত্রণে আয়োজিত এই দুই দিনের সরকারি সফরে (১৭-১৮ মে) মোদির সুইডেন সফর ২০২৬ কেন্দ্র করে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সবুজ শক্তি রূপান্তর এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ২০১৮ সালের পর এটি প্রধানমন্ত্রী মোদির সুইডেনে প্রথম সফর।

দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে কী কী বিষয় আলোচনা হবে

বিদেশ মন্ত্রণালয় (MEA) সূত্রে জানা গেছে, দুই প্রধানমন্ত্রী ভারত-সুইডেন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামগ্রিক পর্যালোচনা করবেন এবং বেশ কয়েকটি কৌশলগত ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন পথ খুঁজে বের করবেন। এর মধ্যে রয়েছে সবুজ শক্তি রূপান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদীয়মান প্রযুক্তি, স্টার্টআপ সংস্কৃতি, প্রতিরোধী সাপ্লাই চেইন, প্রতিরক্ষা উৎপাদন, মহাকাশ গবেষণা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং জনগণের মধ্যে আদান-প্রদান। সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হবে ইউরোপিয়ান রাউন্ড টেবিল ফর ইন্ডাস্ট্রি (ERT) নামক প্রভাবশালী প্যান-ইউরোপীয় শিল্পমঞ্চে মোদি ও ক্রিস্টারসনের যৌথ ভাষণ, যেখানে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডেয়ার লেয়েনও অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।

ভারত-সুইডেন বাণিজ্য: সংখ্যার ভাষায়

ভারত ও সুইডেনের মধ্যে বর্তমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক এক শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে। ২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৭৫ কোটি মার্কিন ডলার বা USD ৭.৭৫ বিলিয়ন। ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সুইডেন থেকে ভারতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) পৌঁছেছে USD ২.৮২৫ বিলিয়নে। এই পরিসংখ্যানগুলি ইঙ্গিত দেয় যে গোথেনবার্গ বাণিজ্য আলোচনায় আর্থিক অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করার বিষয়ে উভয় পক্ষই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগোচ্ছে। সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ভারত-EU মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে এই সফর বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ইউরোপের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরালো করার এটি একটি বিরল সুযোগ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভলভো ইন্ডিয়ার প্রধান কমল বালি এই সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী মোদির গোথেনবার্গ সফর একটি বিশাল সুযোগ এবং এটি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে।” সুইডিশ ব্যবসায়িক মহল ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তিতে ভারতীয় প্রতিভার বিষয়ে আশাবাদী বলে তিনি জানান।

পাঁচ দেশের সফরে সুইডেন তৃতীয় গন্তব্য

প্রধানমন্ত্রী মোদি UAE থেকে শুরু করে নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়ে এবং ইতালি — এই পাঁচ দেশের ছয় দিনের সফরে বের হয়েছেন। UAE-তে তিনি প্রেসিডেন্ট শেখ মোহামেদ বিন জায়েদ আল নাহইয়ানের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব ও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে আলোচনা করেছেন। নেদারল্যান্ডসে প্রতিরক্ষা, সেমিকন্ডাক্টর এবং জল ব্যবস্থাপনা ছিল মূল আলোচনার বিষয়। সুইডেনের পর মোদি নরওয়েতে যাবেন এবং ১৯ মে অসলোতে তৃতীয় ভারত-নর্ডিক শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেবেন, যেখানে নরওয়ে, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও সুইডেনের নেতারা একত্রিত হবেন। সফরের সমাপনী পর্বে ইতালিতে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে ২০২৫-২০২৯ যৌথ কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।

২০১৮-এর ভিত্তির উপর নতুন মাত্রা

২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রথমবার সুইডেন সফর করেন এবং ঐতিহাসিক প্রথম ভারত-নর্ডিক শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেন। সেই সফরেই ভারত-সুইডেন যৌথ উদ্ভাবন অংশীদারিত্ব (Joint Innovation Partnership) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২৬-এর সফরে সেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ভারত-সুইডেন যৌথ কর্মপরিকল্পনাকে (Joint Action Plan) আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করার লক্ষ্যে কাজ করা হবে বলে MEA জানিয়েছে। ইরান-মার্কিন সংঘাতের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের পুনর্বিন্যাস নিয়েও আলোচনা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আসাম বরাক উপত্যকার প্রেক্ষাপট

ভারত-সুইডেন বাণিজ্যিক সম্পর্ক শক্তিশালী হলে দেশের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলি, বিশেষ করে আসামের মতো উন্নয়নশীল অঞ্চলেও তার প্রভাব পড়তে পারে। সুইডিশ কোম্পানিগুলি সবুজ শক্তি, যানবাহন এবং ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করে। ভারতে তাদের বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে উত্তর-পূর্ব ভারতের কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি খাতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে। হাইলাকান্দি জেলার লালা শহরের মতো তৃণমূল অঞ্চলগুলিতে ডিজিটাল অবকাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়নে সুইডিশ প্রযুক্তি বিনিয়োগের পরোক্ষ সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দেশের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যখন বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে, তখন সেই উন্নয়নের সুফল যাতে উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছায়, সেটাই প্রত্যাশা।

গোথেনবার্গে মোদির সুইডেন সফর ২০২৬ শুধু দুটি দেশের মধ্যে একটি কূটনৈতিক বৈঠক নয়, বরং এটি ভারতের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক উচ্চাভিলাষের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। ভারত-EU মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির নতুন বাস্তবতায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক চাপের মধ্যে সুইডেনের মতো প্রযুক্তি ও সবুজ উদ্ভাবনে অগ্রণী একটি দেশের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা ভারতের জন্য অত্যন্ত কৌশলগত। সফর শেষে কী ধরনের চুক্তি বা সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়, তার দিকে দেশ-বিদেশের নজর থাকবে।

মোদির সুইডেন সফর ২০২৬: গোথেনবার্গে বাণিজ্য, AI ও সবুজ প্রযুক্তিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা
Scroll to top