কাছাড় জেলায় ১৭ মে ২০২৬ শুক্রবার বিকেলে জাটিঙ্গা নদীতে সেতু ধস এর ঘটনায় বরাক উপত্যকায় বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আসামের বরখোলা বিধানসভা কেন্দ্রের পুরন্দরপুর ও বাদারপুরের সংযোগকারী একটি নির্মাণাধীন RCC সেতুর মাঝের অংশ হঠাৎ নদীতে ভেঙে পড়ে। আনুমানিক ১০ কোটি ৭৭ লক্ষ টাকা ব্যয়ে তৈরি হওয়া এই সেতু নির্মাণ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ভেঙে পড়ায় এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সৌভাগ্যবশত এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
সেতু ধসের ঘটনা: কী ঘটেছিল সেদিন
শুক্রবার বিকেলে কাছাড় জেলায় প্রবল বৃষ্টিপাত চলছিল। বরখোলা ও কাটিগোরাহ টেরিটোরিয়াল রোড ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানে তৈরি হওয়া এই সেতুটি মুখ্যমন্ত্রীর ‘উন্নত পকিপথ নির্মাণ আচনি’ প্রকল্পের অধীনে নির্মিত হচ্ছিল। জাটিঙ্গা নদীতে সেতু ধস ঘটে যখন নদীর স্রোতের চাপে সেতুর কেন্দ্রীয় কাঠামো একটানা ধুয়ে পড়তে থাকে এবং মুহূর্তের মধ্যে মাঝের স্প্যানটি নদীতে পড়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সেতু নির্মাণে কংক্রিট পিলারের পরিবর্তে সাময়িক কাঠের খুঁটি ব্যবহার করা হয়েছিল, যা নদীর স্রোত সামলাতে পারেনি। এই দাবি সত্য হলে নির্মাণকাজে গুরুতর অনিয়মের প্রশ্ন উঠে।
কাছাড় নির্মাণাধীন সেতু: ইতিহাস ও প্রকল্পের বিবরণ
এই সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল ২০২৪ সালের ১ মার্চ। সেদিন সিলচারের সাংসদ রাজদীপ রয় এবং বরখোলা বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক মিসবাহুল ইসলাম লস্কর উপস্থিত থেকে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন। প্রকল্পের ফলকে লেখা ছিল মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১০,৭৭,৭১,৪০০ টাকা। রাজ্য সরকারের অন্যতম উচ্চাকাঙ্ক্ষী সড়ক পরিকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এটি তৈরি হচ্ছিল, যার লক্ষ্য ছিল পুরন্দরপুর থেকে বাদারপুরের মধ্যে সারাবছর যোগাযোগ নিরবচ্ছিন্ন রাখা। সেতু ধসের পর সেই স্বপ্ন হোঁচট খেয়েছে।
কাছাড়ে সেতু ধসের এই ঘটনায় রাজ্যের অবকাঠামো নির্মাণে মান নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতার অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একটি দশ কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পে যদি এভাবে কাঠের সাময়িক খুঁটি ব্যবহার করা হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে ঠিকাদার কোথায় টাকা সরিয়েছেন এবং প্রকৌশলী তদারকিতে কোথায় গলদ ছিল। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘটনায় উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবি উঠেছে এবং গণরোষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
বরাক উপত্যকা বন্যা ও অবকাঠামো বিপর্যয়
জাটিঙ্গা নদীতে সেতু ধসের ঘটনা ঘটেছে এমন একটি সময়ে, যখন টানা বৃষ্টি ও বন্যায় বরাক উপত্যকা বিপর্যস্ত। শুক্রবার বরাক উপত্যকায় ভারী বৃষ্টিপাতের জেরে সিলচারে ব্যাপক জলজমার পাশাপাশি একাধিক নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। হিন্দুস্তান সমাচারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ৭২ ঘন্টার টানা বৃষ্টিতে শুধু কাছাড় নয়, হাইলাকান্দি জেলাতেও একটি RCC সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মৌসুমি বৃষ্টির আগে থেকেই এই অঞ্চলের সেতু ও সড়ক পরিকাঠামো দুর্বল অবস্থায় থাকায় প্রতি বছর বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
হাইলাকান্দি ও লালা শহর: একই বিপদের প্রতিচ্ছবি
এই ঘটনার সঙ্গে হাইলাকান্দি জেলার, বিশেষ করে লালা শহরের, একটি স্পষ্ট সংযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালেই লালা টাউনশিপের কাছে কাটাখাল নদীর ওপর নির্মাণাধীন একটি ১৮০ মিটার সেতুর ৯০ মিটার অংশ ভেঙে পড়েছিল। সেই সময় হাইলাকান্দি PWD-র জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার বিলাল আহমেদ স্বীকার করেছিলেন যে লোহার জয়েস্টগুলি কাঠের বিমের উপর রাখা হয়েছিল এবং সেগুলি জলের চাপ সহ্য করতে পারেনি। সেই ঘটনায় ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ১ কোটি টাকা। কাছাড়ের বর্তমান ঘটনার সঙ্গে লালার সেই ঘটনার মিল লক্ষণীয় — দুটো ক্ষেত্রেই কাঠের অস্থায়ী অবকাঠামো ব্যবহার এবং পরিদর্শনের অভাবের অভিযোগ।
লালা বাজার ও হাইলাকান্দির মানুষ প্রতিটি বর্ষায় এই একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন — রাস্তা, সেতু ও নালা ভেঙে পড়ে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, কৃষি ও ব্যবসায় ক্ষতি হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, কোটি কোটি টাকার প্রকল্প কাগজে-কলমে অনুমোদিত হলেও মাঠে গুণমান রক্ষা হচ্ছে কি না। রাজ্য সরকারের বার্ষিক বন্যা প্রস্তুতির বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকাঠামো মান নিয়ন্ত্রণ জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
তদন্তের দাবি, জবাবদিহিতার প্রশ্ন
কাছাড়ের এই সেতু ধসের ঘটনায় বিরোধী রাজনৈতিক মহল ও নাগরিক সংগঠনগুলি তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের কাছে উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবি তুলেছে। সেতু নির্মাণে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার ও নজরদারি প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জোরালো হচ্ছে। স্মর্তব্য, বরখোলা আসনের বিধায়ক মিসবাহুল ইসলাম লস্কর নিজেই এই সেতুর উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন। তাই এই প্রশ্ন এড়ানোর উপায় নেই যে নির্মাণের মান পর্যবেক্ষণে জনপ্রতিনিধির ভূমিকা কতটা ছিল।
জাটিঙ্গা নদীতে সেতু ধসের ঘটনা আসামের অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘদিনের একটি মূল সমস্যাকে আবারও সামনে এনেছে — প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থ ও বাস্তবে নির্মাণের মানের মধ্যে বিশাল ফাঁক। সরকার যদি এবার কার্যকর তদন্ত করে ঠিকাদার থেকে প্রকৌশলী পর্যন্ত দায়িত্বশীলদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে, তাহলে জনগণের কষ্টার্জিত করের অর্থ আবারও বৃথা যাবে। বরাক উপত্যকার মানুষ এখন অপেক্ষায় — শুধু তদন্তের ঘোষণা নয়, বাস্তব পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে।