কাছাড় জেলার কাটিগড়ায় হলি ফ্লাওয়ার সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুলের শ্রেণিকক্ষে পাঁচ বছর বয়সী সাকিব আলমের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন মোড় এসেছে। মৃত শিশুটির পরিবার এই ঘটনায় পুলিশে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করেছে। সাকিব আলম মৃত্যুর পর তাঁর মা এতটাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন যে তিনি এখন চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন। ৬ মে ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) কাটিগড়ার এই বেসরকারি বিদ্যালয়ে টিফিন বিরতিতে কেজি-১ ছাত্র সাকিব গলায় খাবার আটকে (choking) অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কাটিগড়া মডেল হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকা জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও বিচারের দাবি ক্রমশ জোরাল হচ্ছে।
শোকার্ত পরিবার ও হাজারো মানুষের জানাজা
সাকিব আলমের জানাজায় এক হাজারেরও বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করেন। জানাজায় উপস্থিত মানুষজন এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপের দাবিতে স্লোগান দেন। গঙ্গানগর এলাকার বাসিন্দা হারিস উদ্দিনের একমাত্র সন্তানকে হারানোর পর পুরো পরিবারটি শোকের গভীর অন্ধকারে তলিয়ে গেছে। সাকিব আলম মৃত্যুর খবরে তাঁর মা এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন যে তাঁকে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করতে হয়েছে এবং জানানো হয়েছে পরিবার পুলিশে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করেছে।
ঘটনার পরপরই ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও এলাকাবাসীরা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে তীব্র বিক্ষোভ দেখান এবং CCTV ফুটেজের পূর্ণ তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার দাবি জানান। ছোট একটি শহরে এতজন মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই ঘটনার গভীর সামাজিক প্রভাবেরই প্রতিফলন।
CCTV ফুটেজে কী ধরা পড়ল — অবহেলার গুরুতর অভিযোগ
এই ঘটনায় সবচেয়ে আলোড়ন ফেলেছে শ্রেণিকক্ষের CCTV ফুটেজ। ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে সাকিব মেঝেতে পড়ে প্রায় ২ থেকে ৩ মিনিট ধরে কষ্ট পাচ্ছিল। অভিযোগ, সেই সময় কর্তব্যরত শ্রেণিশিক্ষিকা এবং তাঁর সহকারী পরস্পরের মধ্যে কথাবার্তায় মগ্ন ছিলেন এবং শিশুটির দিকে মনোযোগ দেননি। এমনকি অন্য এক সহপাঠী বিষয়টি শিক্ষিকাকে জানানোর পরেও দ্রুত ও কার্যকর সাড়া দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
মেঝেতে পড়ে থাকার প্রায় ৫ মিনিট পর সাকিবকে মাটি থেকে তুলে হাসপাতালে নেওয়া হয়। Choking-এর মতো পরিস্থিতিতে প্রতিটি সেকেন্ড মূল্যবান — চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, শ্বাসনালীতে কিছু আটকে যাওয়ার পর মাত্র ৪-৬ মিনিটের মধ্যে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব ঘটতে পারে এবং পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। বিদ্যালয়ের প্রিন্সিপাল চুমকি দাস সংবাদমাধ্যমে বিদ্যালয়ের “আংশিক দায়িত্ব” স্বীকার করলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে শিলচর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে প্রেরিত অটোপসি রিপোর্টের অপেক্ষা করছে পুলিশ।
বরাক উপত্যকার বিদ্যালয়গুলিতে এই ঘটনার প্রভাব
কাছাড়ের কাটিগড়ায় সাকিব আলম মৃত্যুর এই ঘটনা হাইলাকান্দি জেলার লালাসহ সমগ্র বরাক উপত্যকার বেসরকারি বিদ্যালয়গুলির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কেজি বা প্রাথমিক স্তরের শিশুরা শ্রেণিকক্ষে নিজেদের শারীরিক বিপদ সঠিকভাবে জানাতে পারে না — তাই শিক্ষকদের সদা সজাগ থাকা এবং Emergency Response প্রোটোকল জানা অপরিহার্য। হাইলাকান্দির বিদ্যালয়গুলির পরিচালনা সমিতি ও জেলা শিক্ষা বিভাগের উচিত এখনই নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে First Aid প্রশিক্ষণ ও জরুরি চিকিৎসা প্রোটোকল বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া।
প্রতিটি বেসরকারি বিদ্যালয়কে শিক্ষার্থীদের টিফিনের সময় বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা রাখতে হবে, বিশেষত ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে। পাশাপাশি junk food বা অনিরাপদ খাবার বিদ্যালয়ে আনার বিষয়ে অভিভাবকদের নিয়মিত সচেতন করা প্রয়োজন।
সাকিব আলমের পরিবারের দায়ের করা মামলা এবং শিলচর মেডিকেলের অটোপসি রিপোর্টই এখন নির্ধারণ করবে এই ঘটনায় কার কী দায় ছিল এবং কারা আইনি পরিণতির মুখে পড়বেন। কাটিগড়ার মানুষ ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষায় রয়েছেন — এবং এই তদন্তের ফলাফল শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, গোটা বরাক উপত্যকার বিদ্যালয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।