ইতিহাস তৈরি হলো আজ, ৯ মে ২০২৬। শুভেন্দু অধিকারী কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে পশ্চিমবঙ্গের নবম তথা প্রথম BJP মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেন। শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, BJP সভাপতি নিতিন নবীন এবং NDA-শাসিত রাজ্যগুলির মুখ্যমন্ত্রীরা উপস্থিত থাকার কথা। শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গের প্রথম BJP মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার এই ঘটনা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক — কারণ এর মধ্য দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) প্রায় ১৫ বছরের নিরবচ্ছিন্ন শাসনের অবসান ঘটলো।
২০৭ আসনের ঐতিহাসিক জয় — কীভাবে ভাঁজ হলো TMC?
এবারের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে BJP একাই ২০৭টি আসনে জয় পেয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে — যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা ১৪৮ ছাড়িয়ে অনেক দূরে। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৯২ শতাংশ — যা রাজ্যের ইতিহাসে অন্যতম উচ্চ রেকর্ড। TMC-র পতনের পেছনে দীর্ঘদিনের শাসনে ভোটারদের ক্লান্তি, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং BJP-র সুসংগঠিত সাংগঠনিক প্রচার একটি বড় ভূমিকা রেখেছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
শুভেন্দু অধিকারী নিজে নন্দীগ্রাম কেন্দ্র থেকে ২০২১ সালের পর ২০২৬-এও TMC প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেছেন — এবারের ব্যবধান আগের চেয়ে আরও বড় ছিল বলে টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া জানিয়েছে। পাশাপাশি, ভবানীপুর কেন্দ্রেও তিনি মমতাকে ১৫,০০০-এর বেশি ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছেন। এই দ্বৈত পরাজয় তৃণমূলের জন্য মনোবলের দিক থেকে একটি বড় আঘাত।
শুভেন্দুর নির্বাচন — অমিত শাহের ঘোষণা ও প্রথম প্রতিক্রিয়া
৮ মে শুক্রবার কলকাতায় BJP বিধায়ক দলের বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে শুভেন্দু অধিকারীর নাম উঠে আসে। অমিত শাহ বৈঠক পরিচালনা করেন এবং ঘোষণা দেন — “আটটি প্রস্তাব পাওয়া গেছে, এবং সবকটিতেই একটিই নাম। দ্বিতীয় কোনো নামের জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু অন্য কোনো নাম আসেনি। তাই আমি শুভেন্দু অধিকারীকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করছি।” এই ঘোষণার পরই শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যপাল R N রবির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রথম BJP-নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের দাবি পেশ করেন।
BJP বিধায়ক দলের নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন — “বাংলায় BJP-র নির্বাচনী ইশতেহারে করা সমস্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হবে এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করা হবে।” উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭০ সালে জন্ম নেওয়া শুভেন্দু পূর্ব মেদিনীপুরের বাসিন্দা এবং ২০২০ সালে TMC ছেড়ে BJP-তে যোগ দিয়েছিলেন।
বাংলাভাষী অধ্যুষিত হাইলাকান্দি-লালার জন্য এই ঘটনার প্রাসঙ্গিকতা
পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গের প্রথম BJP মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন বরাক উপত্যকার লালা ও হাইলাকান্দি জেলার বাংলাভাষী মানুষদের মধ্যেও বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে। এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন প্রায়ই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বসবাস করেন — ফলে বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তন এখানকার মানুষের কাছে সরাসরি পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক স্তরে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, হাইলাকান্দিতে BJP-র সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনী গতিবিধির ওপরেও পশ্চিমবঙ্গের এই ঐতিহাসিক জয়ের প্রভাব পড়তে পারে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
নন্দীগ্রাম, পূর্ব মেদিনীপুর এবং গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে BJP কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উৎসবের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে। শুভেন্দুর নির্বাচনের খবর পৌঁছানোর পর নন্দীগ্রামে বিজয় মিছিল, গুলাল উড়ানো এবং শুভেন্দু-মোদি-শাহের ছবি-সজ্জিত যানবাহনের শোভাযাত্রা হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে কখনো BJP সরকার ক্ষমতায় আসেনি — সেই ইতিহাস আজ বদলে গেল। এখন সবার দৃষ্টি থাকবে নতুন মন্ত্রিসভার গঠন, প্রথম ১০০ দিনের কর্মসূচি এবং TMC-র বিরোধী ভূমিকার দিকে — কারণ এই রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলার সামাজিক ও প্রশাসনিক ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে নির্ধারণ করবে।