আসামের মরিগাঁও জেলার দুই বাসিন্দাকে একটি অত্যাধুনিক সাইবার জালিয়াতি চক্রে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করেছে আহমেদাবাদ সিটি সাইবার ক্রাইম ব্রাঞ্চ। এই চক্রটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে Deepfake ভিডিও তৈরির মাধ্যমে Aadhaar-এর বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে নিরীহ মানুষের নামে জাল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে ঋণ নিচ্ছিল বলে অভিযোগ। আসাম AI Deepfake আধার জালিয়াতির এই মামলায় NDTV ও গুজরাট সমাচার নিশ্চিত করেছে যে গ্রেফতার হওয়া দুই আসামি হলেন মরিগাঁওয়ের ছাত্র রাব্বুল হুসেইন (২৪) এবং একই জেলার বাসিন্দা কাজিমুদ্দিন সিরাজ আলি (৪৯)।
কীভাবে কাজ করত এই AI জালিয়াতি চক্র
আহমেদাবাদ সাইবার ক্রাইম ব্রাঞ্চের তদন্তে উঠে এসেছে এই চক্রের অপরাধপ্রণালী — যা আধুনিক ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুতর দুর্বলতাকে সরাসরি কাজে লাগিয়েছে। চক্রের সদস্যরা প্রথমে ভিকটিমের ছবি WhatsApp ও Instagram-এর মতো সামাজিক মাধ্যম থেকে সংগ্রহ করত। এরপর Google Gemini ও Meta AI-এর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টুল ব্যবহার করে সেই স্থির ছবিগুলি থেকে “Eye Blink” অ্যানিমেশন সম্বলিত Deepfake ভিডিও তৈরি করা হতো — যা দেখতে একেবারে বাস্তব মানুষের মতোই স্বাভাবিক মনে হয়।
এই Deepfake ভিডিও Aadhaar-এর UCL (Unified Connectivity Layer) কিটের সামনে দেখানো হতো, যা “Live Face” ভেরিফিকেশনের জন্য ব্যবহৃত হয়। পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, AI-তৈরি ভিডিও এই বায়োমেট্রিক চেককে সফলভাবে ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছে। একবার যাচাইকরণ পার হলে চক্রের সদস্যরা ভিকটিমের Aadhaar-লিঙ্কড মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি নম্বরে নিয়ে নিত। এর ফলে ব্যাংকিং লেনদেনের সমস্ত OTP সরাসরি প্রতারকদের কাছে পৌঁছে যেত — ভিকটিম কোনো সতর্কবার্তাই পেতেন না। এক আহমেদাবাদের ব্যবসায়ী দুই দিন ধরে ব্যাংকের কোনো OTP না পেয়ে সন্দেহ হওয়ায় পুলিশে যান — সেই অভিযোগ থেকেই তদন্ত শুরু হয়।
তৈরি হওয়া জাল পরিচয় ব্যবহার করে চক্রটি একাধিক ব্যাংকে e-KYC-র মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলার চেষ্টা করে এবং RKBansal, True Credits ও EarlySalary-র মতো অনলাইন ঋণদাতা প্ল্যাটফর্মে ঋণের আবেদন করে। একটি ঘটনায় Jio Payments Bank-এ সফলভাবে ₹২৫,০০০ ঋণ পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে।
কে কী ভূমিকায় ছিলেন — চক্রের কাঠামো
গুজরাট সমাচার ও NDTV-র প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে এই অন্তর্রাজ্য চক্রের স্পষ্ট বিভাজন দেখা যায়। প্রথম দফায় ২৮ এপ্রিল আহমেদাবাদ সাইবার পুলিশ গুজরাট থেকে চারজনকে গ্রেফতার করে — কানুভাই পারমার, আশিশ ভান্ড, মোহাম্মদ কাইফ পটেল ও দীপ গুপ্তা। এরপর ৬ থেকে ৮ মে দ্বিতীয় দফায় গ্রেফতার হন আরও তিনজন — যার মধ্যে দুজন আসামের মরিগাঁও জেলার।
আসাম AI Deepfake আধার জালিয়াতিতে রাব্বুল হুসেইনের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ — তিনি Deepfake তৈরি এবং জাল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার প্রযুক্তিগত কাজ পরিচালনা করতেন। কাজিমুদ্দিন সিরাজ আলির ভূমিকা ছিল money laundering বা অর্থ পাচারের — চুরি যাওয়া ঋণের অর্থ তাঁর নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সরানো হতো। উত্তরপ্রদেশের কুশিনগরের কৃষ্ণ রামপ্রতাপ মতিলাল প্রজাপতি (২২) কাজ করতেন ডেটা ব্রোকার হিসেবে — ভিকটিমের Aadhaar নম্বর ও ছবি সংগ্রহ করে অন্য সদস্যদের কাছে কমিশনের বিনিময়ে পাঠাতেন।
বরাক উপত্যকা ও লালার জন্য এই ঘটনার সতর্কবার্তা
আসামের মরিগাঁও থেকে এই সাইবার জালিয়াতি চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার হওয়ার ঘটনা সমগ্র আসাম জুড়ে, বিশেষত হাইলাকান্দি ও লালা শহরের মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা বহন করছে। ডিজিটাল পেমেন্ট ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার বরাক উপত্যকায় দ্রুত বাড়ছে — একই সঙ্গে বাড়ছে সাইবার প্রতারণার ঝুঁকিও। এই মামলায় দেখা গেছে, প্রতারকরা সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা সাধারণ ছবি ব্যবহার করেই Aadhaar-এর বায়োমেট্রিক ফাঁকি দিতে পারছে — যা যেকোনো সাধারণ নাগরিকের জন্য বিপজ্জনক।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, নিজের Aadhaar-লিঙ্কড মোবাইল নম্বর নিয়মিত যাচাই করা উচিত এবং হঠাৎ OTP বন্ধ হয়ে গেলে অবিলম্বে ব্যাংক ও UIDAI হেল্পলাইনে যোগাযোগ করতে হবে। পাশাপাশি, সামাজিক মাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি শেয়ারের বিষয়ে সতর্ক থাকা এখন আর বিকল্প নয় — এটি একটি জরুরি প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।
আহমেদাবাদ সাইবার ক্রাইম ব্রাঞ্চের তদন্ত এখনও চলছে এবং পুলিশ এই চক্রের আরও সদস্যদের খুঁজছে বলে জানা গেছে। UIDAI-ও এই ধরনের Deepfake-ভিত্তিক আক্রমণ ঠেকাতে তাদের লাইভ ফেস ভেরিফিকেশন পদ্ধতি আরও শক্তিশালী করার কথা বিবেচনা করছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই মামলা ডিজিটাল পরিচয় সুরক্ষার ক্ষেত্রে ভারতের নীতিনির্ধারক মহলে একটি বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে — কারণ আজ যে প্রযুক্তি জালিয়াতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের কাছেও সহজলভ্য।