হাইলাকান্দি জেলার লালাবাজার থেকে উঠে আসা একজন পদার্থবিদ এবার বিশ্বমঞ্চে দেশ ও অঞ্চলের নাম উজ্জ্বল করলেন। নলবাড়ী জেলার টিহু কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ড. অতনু নাথ ২০২৬ সালের Breakthrough Prize in Fundamental Physics পুরস্কার পেয়েছেন — যা “বিজ্ঞানের অস্কার” নামে পরিচিত। লালাবাজারের অতনু নাথের এই Breakthrough Prize অর্জন উত্তর-পূর্ব ভারতের ইতিহাসে এক মাইলফলক, কারণ তিনিই এই অঞ্চলের প্রথম বিজ্ঞানী যিনি এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার পেলেন। অতনু নাথ ৩৭৬ জন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীর একটি বৈশ্বিক দলের অংশ হিসেবে এই পুরস্কার পেয়েছেন — যে দলটি CERN, Brookhaven National Laboratory ও Fermilab-এ Muon g−2 পরীক্ষা পরিচালনার জন্য স্বীকৃত হয়েছে।
Muon g−2 গবেষণা — পদার্থবিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত
Breakthrough Prize প্রতি বছর পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও গণিতে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়। এই পুরস্কারের মোট অর্থমূল্য $৩ মিলিয়ন, যা ৩৭৬ জন বিজ্ঞানীর মধ্যে ভাগ হয়েছে। পুরস্কারটি প্রতিষ্ঠা করেছেন Silicon Valley-র উদ্যোক্তা ইউরি মিলনার, মেটার CEO মার্ক জাকারবার্গ সহ একাধিক প্রযুক্তি উদ্যোক্তা — যারা বিজ্ঞানকে সংস্কৃতি ও সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসতে চান।
এ বছর যে গবেষণার জন্য পুরস্কার দেওয়া হয়েছে সেটি হলো Muon g−2 পরীক্ষা। Muon একটি অতি-ক্ষুদ্র মৌলিক কণা, যা ইলেকট্রনের মতো কিন্তু তার চেয়ে প্রায় ২০০ গুণ ভারী। এই কণাটি চৌম্বক ক্ষেত্রে কীভাবে আচরণ করে তা পরিমাপ করার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের “Standard Model”-এর বাইরের নতুন পদার্থবিজ্ঞানের সন্ধান করছেন। NDTV-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরীক্ষার ফলাফল আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম রহস্যের দরজা খুলে দিতে পারে — যা ডার্ক ম্যাটার ও অজানা কণার অস্তিত্ব সম্পর্কে নতুন তথ্য দিতে পারে। ড. অতনু নাথ এই আন্তর্জাতিক Muon g−2 সহযোগিতায় তাঁর কাজের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক স্বীকৃতির অংশ হয়েছেন।
ভারত থেকে এই পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রায় ১১ জন বিজ্ঞানীর মধ্যে অতনু নাথ এক অনন্য অবস্থানে রয়েছেন। তিনিই একমাত্র ভারতীয় পুরস্কারপ্রাপক যিনি এই পুরস্কার ঘোষণার সময় ভারতে থেকে কাজ করছিলেন — বাকিরা বিদেশের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। এটি তাঁর অর্জনকে আরও বিশেষ করে তোলে — দেশের মাটিতে থেকেই বৈশ্বিক বিজ্ঞানের শীর্ষ পুরস্কার অর্জনের নজির তিনি স্থাপন করলেন।
বিজ্ঞানী, রবীন্দ্রসংগীতপ্রেমী — অতনু নাথের বহুমাত্রিক পরিচয়
ড. অতনু নাথের ব্যক্তিত্বের একটি অনন্য দিক উঠে এসেছে — তিনি কেবল একজন মেধাবী পদার্থবিদ নন, একজন রবীন্দ্রসংগীতপ্রেমী শিল্পীসত্তার অধিকারীও। তিনি নিজেই বলেছেন যে পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংগীতের মধ্যে তিনি একটি গভীর সামঞ্জস্য অনুভব করেন — দুটিই তাঁর কাছে ছন্দ ও শৃঙ্খলার ভিন্ন দুটি রূপ। লালাবাজারের মাটিতে বড় হয়ে ওঠা অতনু নাথ বরাক উপত্যকার বাংলা সংস্কৃতির মধ্যে যে শিল্পের স্বাদ পেয়েছেন, তা-ই তাঁর বৈজ্ঞানিক যাত্রার পথকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। পদার্থবিজ্ঞানের কঠিন সমীকরণের পাশে রবীন্দ্রনাথের গানের মর্মবাণী — এই দুই ধারার মিলনেই তৈরি হয়েছে ড. নাথের অনন্য ব্যক্তিত্ব।
ড. অতনু নাথ টিহু কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি তরুণ গবেষকদের গবেষণা ক্যারিয়ারের দিকে অনুপ্রাণিত করার কাজ করে যাচ্ছেন — এবং যুব প্রজন্মকে বলছেন যে বিশ্বমানের গবেষণার জন্য শুধু বিদেশে যাওয়া জরুরি নয়, দেশের মাটিতে থেকেও সেরা বিজ্ঞান করা সম্ভব।
লালাবাজার থেকে বিশ্বমঞ্চে — হাইলাকান্দির গর্ব
ড. অতনু নাথের জন্মস্থান লালাবাজার — হাইলাকান্দি জেলার এই ছোট শহর থেকেই তাঁর বৈজ্ঞানিক যাত্রার শুরু। তিনি লালাবাজার, হাইলাকান্দির বাসিন্দা এবং উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে এই বিরল সম্মান পাওয়া প্রথম ব্যক্তি। আসামের CM হিমন্ত বিশ্ব শর্মা X-এ পোস্ট করে অভিনন্দন জানিয়েছেন — “হাইলাকান্দি থেকে বিশ্বমঞ্চে। ড. অতনু নাথকে Breakthrough Prize in Fundamental Physics জেতার জন্য অভিনন্দন — যাকে প্রায়ই ‘বিজ্ঞানের অস্কার’ বলা হয়। তাঁর অর্জন সমগ্র উত্তর-পূর্বের গর্বের বিষয় এবং তরুণ মনের জন্য অনুপ্রেরণা।”
LalaBazar.com-এর পাঠকদের জন্য এই খবর বিশেষভাবে আনন্দের — কারণ ড. নাথ আমাদের নিজেদের শহরের সন্তান। লালা শহরের যে রাস্তায়, যে পরিবেশে তাঁর শৈশব কেটেছে, সেই একই মাটি আজ বিশ্বের সেরা বৈজ্ঞানিক পুরস্কারের গৌরবে আলোকিত। এই অর্জন হাইলাকান্দি জেলার তরুণ প্রজন্মের সামনে — বিশেষত লালা ও এর আশপাশের স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সামনে — নতুন দিগন্তের দরজা খুলে দিয়েছে।
ড. অতনু নাথের এই অর্জন বরাক উপত্যকার বিজ্ঞানচর্চার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে ঢাকা বা দিল্লি নয়, লালাবাজারের মতো ছোট শহর থেকেও বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীদের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। আগামী দিনে তাঁর গবেষণাপথ কোন দিকে যাবে, Muon g−2 পরীক্ষার ফলাফল পদার্থবিজ্ঞানের Standard Model-কে কতটা চ্যালেঞ্জ করবে — সেই প্রশ্নের উত্তর বৈজ্ঞানিক মহলে এখন সবচেয়ে আলোচিত। আর লালাবাজারের মানুষের কাছে ড. নাথ হয়ে উঠেছেন এক নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণার কেন্দ্র।