Read today's news --> ⚡️Click here 

শিলচর জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত বরাক উপত্যকা — প্রাক-মৌসুমী বৃষ্টিতে ফের নিকাশি ব্যর্থতার মুখোশ খুলল

মে মাসের শুরুতেই প্রাক-মৌসুমী বৃষ্টিতে শিলচর জলাবদ্ধতার পরিচিত ছবি ফিরে এসেছে। ২ মে ২০২৬ তারিখে টানা বৃষ্টির ফলে শিলচরের নিউ শিলচর এলাকা, লিংক রোডের আশপাশের গলিঘুপচি এবং শহরের একাধিক নিচু অঞ্চল হাঁটুজলে ডুবে যায়। বরাক উপত্যকার এই প্রধান শহরে বৃষ্টির পানি বের হওয়ার পথ না থাকায় বাসিন্দাদের পানি ভেঙে চলাফেরা করতে হয় এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। শিলচর জলাবদ্ধতার এই সমস্যা নতুন নয় — কিন্তু প্রতিবার বর্ষা মৌসুমের আগেই এই দৃশ্য পুনরাবৃত্তি হওয়া দীর্ঘস্থায়ী পরিকাঠামো ব্যর্থতার স্পষ্ট প্রমাণ।

কোথায় কোথায় জলাবদ্ধতা, কেন এই সংকট?

লিংক রোড সংলগ্ন গলিগুলো, নিউ শিলচর এলাকার নিচু অংশ এবং শহরের একাধিক পুরনো মহল্লা শনিবার সকাল থেকেই পানির নিচে ছিল। বাসিন্দারা হাঁটুজল ভেঙে বাজার ও কাজে যেতে বাধ্য হয়েছেন এবং স্বাস্থ্যবিধি ও পানিবাহিত রোগের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পাশাপাশি উজানে টানা বৃষ্টির কারণে বরাক নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় শহরের নিচু এলাকাগুলোতে বন্যার ঝুঁকি আরও তীব্র হয়েছে।

শিলচরের নিকাশি সমস্যার মূল কারণটি সুপরিচিত। বছরের পর বছর ধরে নিকাশি প্রকল্পের কাজ অসম্পূর্ণ থাকা, প্লাস্টিক ও আবর্জনায় ড্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পরিকল্পিত নগর-নিকাশি ব্যবস্থার অভাব — এই তিনটি কারণ একসঙ্গে মিলে সামান্য বৃষ্টিতেও শহরকে ডুবিয়ে দেয়। ২০১৮ সালেও শিলচর পৌরসভার তৎকালীন কমিশনার রাজেশ দাস স্বীকার করেছিলেন, “সমস্ত ড্রেন বন্ধ হয়ে আছে, এটিই জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ।” সেই সমস্যা ২০২৬ সালেও অপরিবর্তিত রয়েছে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও IMD-সতর্কতা

জনরোষ তীব্র হওয়ার মধ্যে BJP-র প্রাক্তন সাংসদ রাজদীপ রায় জলমগ্ন এলাকাগুলো পরিদর্শনে যান এবং বেরেঙ্গা বাঁধ পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখেন। তবে এই ধরনের রাজনৈতিক সফর প্রতিবছরই হয় এবং বাসিন্দারা দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমাধানের অভাবে ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছেন। IMD আগেই ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বরাক উপত্যকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি, বজ্রঝড় এবং ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছিল। তা সত্ত্বেও পূর্বপ্রস্তুতির তেমন প্রমাণ দেখা যায়নি।

উজানে নেমে আসা পার্বত্য বৃষ্টিপাত বরাক নদীর জলস্তরকে দ্রুত বাড়িয়ে তোলে। ২০২২ সালের জুনে বেথুকান্দি বাঁধ ভাঙার পর গোটা শিলচর শহর ডুবে গিয়েছিল এবং লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। সেই বিপর্যয়ের পরেও কাঠামোগত সংস্কার পর্যাপ্ত মাত্রায় হয়নি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের অধ্যাপক পার্থংকর চৌধুরী বলেছিলেন, “স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতই বরাক উপত্যকার বন্যা ও জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ — এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।”

হাইলাকান্দি লালা শহরের প্রাসঙ্গিকতা

শিলচরের মতো হাইলাকান্দি জেলার লালা শহরসহ বরাক উপত্যকার অন্যান্য ছোট শহর ও বাজার এলাকাগুলোও একই ধরনের নিকাশি সমস্যায় ভোগে। IMD-র পূর্বাভাস অনুযায়ী বরাক উপত্যকায় মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আরও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে লালা বাজার এবং হাইলাকান্দির নিচু বসতি এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে সোনাই রোড এবং হাইলাকান্দি রোড ঘিরে থাকা এলাকাগুলো প্রতিবছরই প্রথম বৃষ্টিতে প্লাবিত হয় বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

প্রশাসনিক সতর্কবার্তায় নাগরিকদের জলমগ্ন এলাকায় না যাওয়া, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বন্ধ রাখা এবং মূল্যবান জিনিসপত্র উঁচু স্থানে সরিয়ে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই পরামর্শ বরাক উপত্যকার সমস্ত জেলার জন্যই প্রযোজ্য।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কবে?

শিলচর জলাবদ্ধতার সমস্যা কোনো একটি বছরের ঘটনা নয়। ২০১৮, ২০২২, ২০২৫ এবং এখন ২০২৬ — প্রতিবছরই একই চিত্র পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। মাস্টার ড্রেনেজ প্ল্যান বছরের পর বছর ধরে আলোচনায় আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন থেকে যাচ্ছে অধরা। নতুন সরকার গঠনের পর — যার ফলাফল ৪ মে ঘোষিত হওয়ার কথা — শিলচরসহ গোটা বরাক উপত্যকার নিকাশি পরিকাঠামো উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা, সেটিই এখন এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

শিলচর জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত বরাক উপত্যকা — প্রাক-মৌসুমী বৃষ্টিতে ফের নিকাশি ব্যর্থতার মুখোশ খুলল
Scroll to top