আসামে নতুন সরকারের শপথগ্রহণের ঠিক আগের দিন কংগ্রেস নেতা ভূপেন কুমার বড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন — মহিলা ভোটার যাদের জয়ী করেছেন, সেই BJP সরকার যেন এবার নারীদের সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করে। মহিলা ভোটার BJP-র পক্ষে বড় ভূমিকা রেখেছেন বলে যে তথ্য নির্বাচন পরবর্তী বিশ্লেষণে উঠে আসছে, তা উল্লেখ করে গগৈ হিমন্ত বিশ্বশর্মার নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে সতর্ক করেছেন যে ক্ষমতায় থাকার অর্থ কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয় — দায়বদ্ধতাও।
গগৈয়ের বক্তব্য ও রাজনৈতিক পটভূমি
কংগ্রেস নেতা গগৈ স্পষ্টভাবে বলেছেন, “আসামের মহিলারা BJP-কে সমর্থন করেছেন, ভোট দিয়েছেন এবং একটি বিশাল বিজয় দিয়েছেন। এখন সেই মহিলাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা BJP-র নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব।” তিনি আরও বলেন, নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে গত পাঁচ বছরে আসামের রেকর্ড সন্তোষজনক নয় — বিভিন্ন জেলায় নারী নির্যাতন, পাচার ও যৌন হিংসার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিরোধী দল হিসেবে কংগ্রেস এই বিষয়টিকে আগামী দিনের রাজনৈতিক এজেন্ডার কেন্দ্রে রাখতে চাইছে।
২০২৬ সালের আসাম বিধানসভা নির্বাচনে NDA-র ১০২ আসনের ভূমিধস বিজয়ে নারী ভোটারদের ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। নির্বাচন-পরবর্তী বিভিন্ন মিডিয়া বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সরকারের “অরুণোদৈ” প্রকল্প — যেখানে প্রতিটি পরিবারের মহিলা সদস্যকে মাসিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয় — নারী ভোটারদের মধ্যে BJP-র পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব তৈরিতে সহায়তা করেছে।
নারী নিরাপত্তা ও আসামের পরিসংখ্যান
ভারতের জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরো (NCRB)-র তথ্য অনুযায়ী, আসাম মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের হারে ভারতের শীর্ষ রাজ্যগুলির একটিতে ধারাবাহিকভাবে স্থান পাচ্ছে। ২০২২ সালে আসামে মহিলাদের বিরুদ্ধে মোট নথিভুক্ত অপরাধের সংখ্যা ছিল ৩০,০০০-এর বেশি। ধর্ষণ, গার্হস্থ্য হিংসা, অপহরণ ও পাচারের ক্ষেত্রে রাজ্যের পরিসংখ্যান জাতীয় গড়ের তুলনায় উদ্বেগজনকভাবে বেশি। মহিলা ভোটার BJP-র হয়ে বিপুল সমর্থন দিলেও তাদের দৈনন্দিন নিরাপত্তার প্রশ্নটি এখনও অমীমাংসিত — এই বার্তাটিই গগৈ তুলে ধরতে চেয়েছেন।
কংগ্রেস নেতা আরও সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়েছেন, নতুন মন্ত্রিসভায় মহিলাদের সংখ্যা, মহিলা অধিকার রক্ষায় বিশেষ সেল গঠন এবং বিদ্যালয়-কলেজ পথে যাতায়াতে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিগুলি তিনি আগামী দিনেও তুলে যাবেন। রাজ্য সরকারের কাছে তাঁর প্রথম দাবি হলো, “নারীবিরোধী অপরাধে দ্রুত বিচারের জন্য ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের সংখ্যা বাড়ানো হোক।”
মহিলা ভোটার ও BJP-র নির্বাচনী কৌশল
২০২৬ সালের আসাম নির্বাচনে BJP নারী কেন্দ্রিক একাধিক প্রকল্পকে সামনে রেখে প্রচার পরিচালনা করেছে। “অরুণোদৈ ২.০” প্রকল্পে প্রতিটি পরিবারের মহিলা সদস্যকে মাসে ১,২৫০ টাকা সরাসরি ব্যাঙ্কে পাঠানো হয়। এছাড়া নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে “আত্মনির্ভর নারী” প্রকল্প, মহিলাদের বিনামূল্যে বাস পরিষেবা এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে ঋণ প্রদানের সুবিধা প্রসারিত করা হয়েছিল। BJP-র নির্বাচনী ইশতেহারে মহিলা-কেন্দ্রিক কর্মসূচিতে বিশেষ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, BJP-র এই “মহিলা ভোটার কৌশল” দেশের বেশ কয়েকটি রাজ্যে সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। মধ্যপ্রদেশে “লাড়লি বহনা” প্রকল্প এবং রাজস্থানে মহিলা প্রকল্পগুলির ধাঁচে আসামেও এই কৌশল কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে বলে দলীয় বিশ্লেষণে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু কংগ্রেসের গগৈ যে প্রশ্ন তুলছেন তা আরও গভীর — আর্থিক সহায়তা পাওয়া মানেই সুরক্ষা পাওয়া নয়।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির নারী নিরাপত্তার প্রাসঙ্গিকতা
মহিলা ভোটার BJP-র পক্ষে ভোট দিয়েছেন এই বাস্তবতা হাইলাকান্দি জেলাতেও প্রযোজ্য। লালা শহর-সহ সমগ্র হাইলাকান্দিতে “ওরুণোদৈ” প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন বহু পরিবারের মহিলারা। তবে বাস্তব চিত্র হলো, হাইলাকান্দি জেলার বিভিন্ন পুলিশ থানায় মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ নিয়মিতভাবে নথিভুক্ত হচ্ছে। বরাক উপত্যকায় নারী পাচার ও বাল্যবিবাহের সমস্যা এখনও গুরুতর। লালা বাজার অঞ্চলের সচেতন মহলের প্রত্যাশা, নতুন সরকার জেলাস্তরে “ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার” ও মহিলা থানার কার্যকারিতা বাড়াবে, এবং গ্রামীণ এলাকায় নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ টহলের ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে।
আগামী ১২ মে হিমন্ত সরকারের শপথগ্রহণের পর মন্ত্রিসভায় মহিলা মন্ত্রীর সংখ্যা এবং নারী কল্যাণ দফতরের দায়িত্বভার কাকে দেওয়া হয় — সেদিকে সকলের নজর থাকবে। গগৈয়ের দাবি কার্যত একটি রাজনৈতিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হয়ে উঠেছে নতুন সরকারের সামনে। মহিলা ভোটারদের বিশ্বাস অর্জন করে ক্ষমতায় আসা সহজ — তবে পাঁচ বছর ধরে সেই বিশ্বাস বজায় রাখাই হবে আসল পরীক্ষা।