
৯ এপ্রিল আসামের ১২৬টি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) করিমগঞ্জ উত্তর পুনর্নির্বাচনের আদেশ জারি করেছে। ১১ এপ্রিল, শুক্রবার, এই কেন্দ্রে নতুন করে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে বলে Guwahati Plus-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে — কারণ করিমগঞ্জ উত্তর কেন্দ্রটি এই অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন হিসেবে পরিচিত।
করিমগঞ্জ উত্তর: প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে পুনর্নির্বাচনের কারণ
করিমগঞ্জ উত্তর কেন্দ্রটি বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ জেলার অন্তর্গত। আজ তাক বাংলার তথ্য অনুযায়ী, এই কেন্দ্রে মোট ভোটারের ৭২.৮৭ শতাংশ গ্রামীণ এবং ২৭.১৩ শতাংশ শহুরে — অর্থাৎ কেন্দ্রটির চরিত্র মিশ্র। এই আসনে ২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে কংগ্রেসের কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ এবং BJP-র ড. মানস দাসের মধ্যে, এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সাহাবুল ইসলাম চৌধুরী উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পেয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন সাধারণত ভোটগ্রহণে গুরুতর অনিয়ম, যান্ত্রিক ত্রুটি বা নিরাপত্তাজনিত কারণে পুনর্নির্বাচনের আদেশ দেয়। এই বিশেষ ক্ষেত্রে ঠিক কোন কারণে পুনর্নির্বাচন আদেশ এসেছে, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিক বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে আসামের বিধানসভা ভোটের ইতিহাসে পুনর্নির্বাচন নতুন কোনো ঘটনা নয়। ২০২১ সালে রাতাবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রে EVM বিতর্কের পর নির্বাচন কমিশন পুনর্নির্বাচনের আদেশ দিয়েছিল এবং চারজন নির্বাচনী কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। সেই ঘটনাটিও ঘটেছিল করিমগঞ্জ জেলাতেই।
৯ এপ্রিলের ভোট: ৮৪.৪২% ভোটার উপস্থিতির পর পুনর্মতদানের নির্দেশ
৯ এপ্রিল সমগ্র আসামে একযোগে ভোটগ্রহণ হয়েছে। Times of India-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, আসামে এবার মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৫০ লক্ষের বেশি। ভোটদিনে বিকেল ৩টার মধ্যেই রাজ্যে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৫.৯১ শতাংশ এবং ভোটগ্রহণ শেষে সামগ্রিক উপস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮৪.৪২ শতাংশে — যা আসামের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য সংখ্যা। বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ উত্তর কেন্দ্রেও ভোটার উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরেই নির্বাচন কমিশনের আদেশে ওই কেন্দ্রে পুনরায় ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ভারতের সংবিধান ও জনপ্রতিনিধিত্ব আইন ১৯৫১ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের কাছে যেকোনো কেন্দ্রে নির্বাচনী অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে পুনর্নির্বাচনের আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। PIB-এর তথ্য অনুযায়ী, আসাম, কেরল ও পুদুচেরিতে ৯ এপ্রিল একযোগে ভোট হয়েছে এবং এই নির্বাচনে মোট ১,৯৫৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ভোটের এই বিশাল পরিসরে যে কোনো একটি কেন্দ্রে অনিয়ম ধরা পড়লে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াই নির্বাচন কমিশনের নিয়মিত অভ্যাস।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির প্রাসঙ্গিকতা
করিমগঞ্জ উত্তর পুনর্নির্বাচনের খবরটি হাইলাকান্দি জেলার লালা টাউন ও আশেপাশের মানুষদের জন্য সরাসরি প্রাসঙ্গিক। করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি দুটিই বরাক উপত্যকার পাশাপাশি জেলা এবং ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক প্রবণতায় এই অঞ্চলের মিল অনেক বেশি। করিমগঞ্জের রাজনৈতিক হাওয়া সরাসরি হাইলাকান্দির ভোটার মনোভাবকেও প্রভাবিত করে। বরাক উপত্যকার তিনটি জেলায় মোট ১৫টি বিধানসভা কেন্দ্র রয়েছে এবং এই অঞ্চলের বাংলাভাষী ভোটাররা আসামের সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। করিমগঞ্জ উত্তর কেন্দ্রে যে অনিয়মের কারণে পুনর্নির্বাচন হচ্ছে, তা সমগ্র বরাক উপত্যকার ভোটারদের নজরে রয়েছে।
আসাম বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬: পটভূমি ও তাৎপর্য
২০২৬ সালের আসাম বিধানসভা নির্বাচনে BJP নেতৃত্বাধীন NDA জোট এবং কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। রাজ্যের ১২৬টি বিধানসভা আসনে একযোগে ভোট হয়েছে। ভোট গণনা নির্ধারিত রয়েছে ৪ মে ২০২৬ এবং ৬ মে-র মধ্যে নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশনা রয়েছে।
করিমগঞ্জ উত্তর কেন্দ্রের ইতিহাস বলছে এটি কংগ্রেস ও BJP-র মধ্যে একটি কঠিন লড়াইয়ের ময়দান। আজ তাক বাংলার তথ্য অনুযায়ী, এই কেন্দ্রে ২০২৬ সালের ভোটে কংগ্রেসের কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ ৬০,৯৯৮ ভোট পেয়েছেন এবং BJP-র ড. মানস দাস পেয়েছেন ৫২,৬৭৪ ভোট — জয়-পরাজয়ের ব্যবধান মাত্র ৫.৭ শতাংশ। এই সংকীর্ণ ব্যবধানের কারণেই পুনর্নির্বাচনের আদেশ নিয়ে দুটি শিবিরই সজাগ দৃষ্টি রাখছে।
১১ এপ্রিলের পুনর্নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে ৪ মে সমগ্র আসামের ভোট গণনার সঙ্গে একযোগে এই কেন্দ্রের ফলাফলও ঘোষণা পাবে। করিমগঞ্জ উত্তরের চূড়ান্ত রায় কোন দিকে যায়, তা কেবল এই একটি আসনের ভাগ্যই নির্ধারণ করবে না — বরাক উপত্যকার সামগ্রিক রাজনৈতিক সমীকরণেও তার প্রভাব পড়বে। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি তার দায়িত্বশীলতার প্রমাণ, এবং ভোটারদের কাছে আশা রাখা স্বাভাবিক যে ১১ এপ্রিলের নতুন ভোট সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ পরিবেশে সম্পন্ন হবে।