
৯ এপ্রিল ২০২৬ আসামের ১২৬টি বিধানসভা আসনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার ঘনিষ্ঠ মহল বা দলের সদস্যদের আটক করা হয়েছে বলে Indian Express জানিয়েছে। হিমন্ত দলের সদস্য আটকের এই ঘটনা ভোট-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে এই কারণে যে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিধানসভায় প্রার্থী হিসেবে লড়েছেন এবং জলুকবাড়ি কেন্দ্র থেকে তাঁর নিজের লড়াইয়ের পাশাপাশি গোটা রাজ্যে BJP-র নির্বাচনী প্রচারণার মুখ ছিলেন তিনি।
ভোটের দিনের পরিস্থিতি ও আটকের ঘটনা
৯ এপ্রিল আসামজুড়ে ভোটগ্রহণ মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হলেও দিনের শেষে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসতে থাকে। Times of India-র তথ্য অনুযায়ী, এবার আসামে মোট ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮৪.৪২ শতাংশ — যা রাজ্যের নির্বাচনী ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। বিকেল ৩টার মধ্যেই ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৫.৯১ শতাংশ।
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর CM হিমন্তের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কিছু ব্যক্তিকে আটক করা হয়। Indian Express-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আটকের ঘটনাটি ঘটেছে এমন এক সময়ে যখন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা নিজে প্রথমবারের মতো বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী। এর আগে তিনি লোকসভা ও রাজ্যসভার মাধ্যমে সংসদীয় রাজনীতিতে থাকলেও বিধানসভায় সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা এটিই প্রথম। কাদের আটক করা হয়েছে এবং কী কারণে — সেই বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ পায়নি, তবে ঘটনাটি BJP-র ভোট-পরবর্তী কৌশলের উপর প্রশ্ন তুলেছে।
CM হিমন্তের প্রথম বিধানসভা লড়াই: জলুকবাড়ির গুরুত্ব
হিমন্ত বিশ্ব শর্মার রাজনৈতিক জীবনে ২০২৬ সালের আসাম বিধানসভা নির্বাচন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গুয়াহাটির জলুকবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তিনি প্রথমবার বিধানসভার মসনদে সরাসরি লড়েছেন। দীর্ঘদিন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা থাকার পর ২০১৫ সালে BJP-তে যোগ দেন হিমন্ত এবং ২০২১ সালে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু এত বছরের রাজনৈতিক জীবনে সরাসরি বিধানসভায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই প্রথম সুযোগটি তাঁর জন্য কার্যত একটি ব্যক্তিগত পরীক্ষাও বটে।
Economic Times-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আসাম নির্বাচনে হিমন্ত বনাম কংগ্রেসের গৌরব গোগৈয়ের লড়াইটি মূলত দুই ব্যক্তিত্বের লড়াই হিসেবেই জনমানসে রূপ নিয়েছিল। ভোটের দিনের শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক উত্তাপ থেমে থাকেনি। ভোট শেষ হওয়ার পরে হিমন্তের ঘনিষ্ঠ মহলের ব্যক্তিদের আটকের ঘটনা সেই উত্তাপকে নতুন মাত্রা দিয়েছে এবং বিরোধী শিবির এটিকে নির্বাচনী অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে দেখাচ্ছে।
আসাম নির্বাচনে ভোট-পরবর্তী অনিয়মের প্রেক্ষাপট
আসামের বিধানসভা নির্বাচনের ইতিহাসে ভোটের দিন ও ভোটের পরে আটক ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২১ সালেও রাতাবাড়ি কেন্দ্রে EVM বিতর্কের পর নির্বাচন কমিশন পুনর্নির্বাচনের আদেশ দিয়েছিল এবং একাধিক নির্বাচনী কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। ২০২৬ সালে ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশন করিমগঞ্জ উত্তর কেন্দ্রে ১১ এপ্রিল পুনর্নির্বাচনের আদেশ দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে হিমন্ত দলের সদস্য আটকের ঘটনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, ভোটগ্রহণ চলাকালীন বা ভোটের পর ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা বা নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া বাধ্যতামূলক। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগে আটক করা হয়েছে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে — সেই বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের অপেক্ষা রয়েছে।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির দৃষ্টিকোণ
আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার এই রাজনৈতিক ঘটনাবলি বরাক উপত্যকার মানুষের কাছেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। হাইলাকান্দি জেলার লালা টাউন ও আশেপাশের মানুষ জানেন যে রাজ্যের CM কে হবেন — সেটি ব্রহ্মপুত্র না বরাক, উভয় উপত্যকার উন্নয়ন নীতিকেই প্রভাবিত করে। হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে বরাক উপত্যকায় পরিকাঠামো উন্নয়নের বেশ কিছু প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। তাই এই নির্বাচনের ফলাফল এবং এর আগে-পরে যে রাজনৈতিক ঘটনাগুলো ঘটছে, তা হাইলাকান্দির সচেতন নাগরিকদের সরাসরি সংশ্লিষ্ট।
ভোট গণনার আগে অনিশ্চয়তা ও পরবর্তী পদক্ষেপ
৯ এপ্রিলের ভোটগ্রহণ শেষ হলেও আসামের রাজনৈতিক পরিবেশ শান্ত হয়নি। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং আটকের ঘটনা ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত রেখেছে। ৪ মে ভোট গণনার আগে এই ধরনের ঘটনাগুলোর তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া কতটা এগোয়, তার উপর নজর রাখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও নাগরিক সমাজ উভয়ই।
হিমন্ত দলের সদস্য আটকের ঘটনা প্রমাণ করে যে ভোটের দিনে বা ভোটের পরে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হলে প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাস্থ্যের দিক থেকে একটি ইতিবাচক বার্তা। তবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হবে — সেটিই এখন আসল প্রশ্ন। ৪ মে-র ভোট গণনার ফলাফল এবং তদন্তের গতিপ্রকৃতি একসঙ্গে আসামের আগামী রাজনৈতিক পথচলা নির্ধারণ করবে।