
গুয়াহাটির কাহিলিপাড়ায় অবস্থিত ভাউবী দেবী চেরাউগী শ্রবণ বাধাগ্রস্ত সরকারি উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২০২৬ সালের HSLC পরীক্ষায় শতভাগ সাফল্য অর্জন করেছে। বিদ্যালয় থেকে মোট ৪৮ জন শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন — এবং প্রত্যেকেই উত্তীর্ণ হয়েছেন। ১০ এপ্রিল ২০২৬ আসাম স্টেট স্কুল এডুকেশন বোর্ড (ASSEB) এই ফলাফল ঘোষণা করে। ভাউবী দেবী চেরাউগী শ্রবণ বিদ্যালয়ের HSLC শতভাগ পাসের পাশাপাশি সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো — এই বিদ্যালয়ের ৪ জন শিক্ষার্থী Artificial Intelligence (AI) বিষয়ে লেটার মার্কস অর্জন করেছেন। যেখানে দেশজুড়ে AI শিক্ষা এখনও নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেখানে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের এই অর্জন সত্যিই অসাধারণ।
বিভাগওয়ারি ও বিষয়ভিত্তিক ফলাফল: AI-তেও শ্রেষ্ঠত্ব
এই বছরের ফলাফলের সম্পূর্ণ পরিসংখ্যান নিচে দেওয়া হলো:
| বিভাগ | শিক্ষার্থীর সংখ্যা |
| মোট পরীক্ষার্থী | ৪৮ জন |
| মোট উত্তীর্ণ | ৪৮ জন (১০০%) |
| প্রথম বিভাগ (1st Division) | ৮ জন |
| দ্বিতীয় বিভাগ (2nd Division) | ৪০ জন |
| লেটার মার্কস (AI বিষয়ে) | ৪ জন |
ASSEB-এর নিয়ম অনুযায়ী, HSLC পরীক্ষায় কোনো বিষয়ে ৭৫ শতাংশ বা তার বেশি নম্বর পেলে লেটার মার্কস দেওয়া হয়। ৪ জন শিক্ষার্থী Artificial Intelligence বিষয়ে এই মাপের নম্বর পেয়েছেন — এটি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, এটি প্রমাণ করে যে এই বিদ্যালয় আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষায়ও পিছিয়ে নেই। ইন্ডিয়ান সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ও ভিজ্যুয়াল পদ্ধতিতে AI-এর মতো জটিল বিষয় শিক্ষাদান করা এবং সেখানে শিক্ষার্থীরা লেটার মার্কস পাওয়া — এটি শিক্ষকদের অসাধারণ দক্ষতার প্রমাণ।
AI শিক্ষা ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী: একটি নতুন অধ্যায়
কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে CBSE ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম শ্রেণি থেকে AI বিষয়টি পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করেছে। Aajkaal-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক দেশের স্কুলগুলোতে তৃতীয় শ্রেণি থেকেই AI পাঠ্যক্রম চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “AI ও কম্পিউটেশনাল থিঙ্কিং শিক্ষণ, চিন্তা ও পড়ুয়াদের শেখার পদ্ধতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।”aajkaal+1
এই প্রেক্ষাপটে ভাউবী দেবী চেরাউগী বিদ্যালয়ের শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা AI বিষয়ে লেটার মার্কস পাওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শ্রবণ ও বাক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও এই শিক্ষার্থীরা একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি বিষয়ে উৎকর্ষ দেখিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে সঠিক শিক্ষণ পদ্ধতি ও শিক্ষকদের প্রতিশ্রুতি থাকলে শারীরিক সীমাবদ্ধতা প্রযুক্তি শিক্ষার পথে বাধা হতে পারে না।
আসাম HSLC ২০২৬-এর সামগ্রিক ফলাফলের প্রেক্ষাপট
১০ এপ্রিল ২০২৬ ঘোষিত HSLC ২০২৬-এর ফলাফলে আসাম রাজ্যের সামগ্রিক পাসের হার ৬৫.৬২ শতাংশ — যা গত বছরের ৬৩.৯৮ শতাংশের চেয়ে উন্নত। Times of India-র তথ্য অনুযায়ী, মোট ৪ লক্ষ ৩৮ হাজার ৫৬৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রথম বিভাগ পেয়েছেন ৮৫,১৮৯ জন, দ্বিতীয় বিভাগ ১,৫০,১৬৭ জন এবং তৃতীয় বিভাগ ৪৬,৩৪৫ জন। মোট ৩,৯৮৩ জন ডিস্টিংশন এবং ১৩,৬৮১ জন স্টার মার্কস পেয়েছেন। Dainik Asam-এর তথ্য অনুযায়ী, জেলাভিত্তিক তালিকায় ডিমা হাসাও (৮৮.২৩%) শীর্ষে রয়েছে, আর সর্বনিম্ন কাছাড় (৪৯.১৩%)।
রাজ্যের গড় ৬৫.৬২ শতাংশের বিপরীতে ভাউবী দেবী চেরাউগী বিদ্যালয়ের ১০০ শতাংশ পাস এবং AI বিষয়ে ৪ জনের লেটার মার্কস — এই তুলনাটি নিজেই বলে দেয় এই বিদ্যালয়ের শিক্ষাদান পদ্ধতি কতটা কার্যকর। একই সময়ে বঙ্গাইগাঁওয়ের ৩০টিরও বেশি সাধারণ স্কুল ৩০ শতাংশের নিচে পাসের কারণে শো-কজ নোটিশ পেয়েছে। শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের এই সাফল্য সেই স্কুলগুলোর জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা।
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার প্রতি বার্তা
সমগ্র আসামে শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য মাত্র দুটি সরকারি বিদ্যালয় রয়েছে — কাহিলিপাড়া ও জোরহাটে। বরাক উপত্যকায় হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ বা কাছাড় — কোনো জেলাতেই এ ধরনের বিশেষ সরকারি বিদ্যালয় নেই। লালা টাউন বা হাইলাকান্দি জেলার শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পরিবারগুলোকে তাই সন্তানদের গুয়াহাটিতে পাঠাতে হয়। এই ৪৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে বরাক উপত্যকার কোনো শিক্ষার্থীও থাকতে পারেন — যিনি পরিবার থেকে শত মাইল দূরে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে আজ AI বিষয়ে লেটার মার্কস পেয়েছেন।
কাহিলিপাড়ার ভাউবী দেবী চেরাউগী শ্রবণ বাধাগ্রস্ত সরকারি উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৯৪৯ সাল থেকে অনবরত প্রমাণ করে আসছে যে শিক্ষার আলো সব বাধা অতিক্রম করতে পারে। ২০২৬ সালে শুধু শতভাগ পাস নয়, AI বিষয়ে লেটার মার্কসও — এই দুটি অর্জন একত্রে এই বিদ্যালয়কে আসামের শিক্ষা জগতে এক বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। রাজ্য সরকারের উচিত এই বিদ্যালয়ের সাফল্যের মডেলটি অনুসরণ করে বরাক উপত্যকায় একটি অনুরূপ বিশেষ বিদ্যালয় স্থাপনের পদক্ষেপ নেওয়া — যাতে হাইলাকান্দি ও আশেপাশের জেলার শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুরা নিজের বাড়ির কাছেই মানসম্মত শিক্ষা পেতে পারেন।