১৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মণিপুর পুলিশ Facebook-এ উস্কানিমূলক ও হিংসাত্মক বিষয়বস্তু প্রকাশের অভিযোগে ইম্ফল পূর্ব জেলার ২৩ বছর বয়সী এক যুবককে গ্রেফতার করেছে। মণিপুর সোশ্যাল মিডিয়া গ্রেফতারের এই ঘটনায় অভিযুক্ত যুবকের নাম তেনসুবাম লামইয়ানবা মেইতেই, যিনি “Meetei Nongsa Lamyanba” নামক একটি Facebook অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতেন। মণিপুর পুলিশ তাদের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টে জানিয়েছে যে ওই অ্যাকাউন্ট থেকে এমন কিছু পোস্ট করা হচ্ছিল যা সরাসরি হিংসার আহ্বান জানাচ্ছিল এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আইনশৃঙ্খলার পক্ষে গুরুতর হুমকি তৈরি করছিল। পুলিশের দাবি, অভিযুক্ত ইম্ফলের সশস্ত্র সংগঠন Arambai Tenggol (AT)-এর সদস্য।
অ্যাকাউন্টে কী ছিল: পুলিশের বক্তব্য এবং অভিযোগের বিস্তারিত
মণিপুর পুলিশ তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “Meetei Nongsa Lamyanba নামের Facebook অ্যাকাউন্টটি থেকে অত্যন্ত উস্কানিমূলক ও হিংসাত্মক বিষয়বস্তু, হুমকি এবং হিংসার আহ্বান সম্বলিত পোস্ট শেয়ার করা হচ্ছিল, যা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার ক্ষমতা রাখে।” পুলিশ আরও জানায়, এই ধরনের বিষয়বস্তু বর্তমান সংঘাতপ্রবণ মণিপুরের পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে আরও উসকে দিতে পারে এবং সহিংসতাকে নতুনভাবে প্রজ্বলিত করতে পারে।
অভিযুক্ত তেনসুবাম লামইয়ানবা মেইতেই সম্পর্কে পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে তিনি Arambai Tenggol (AT) সংগঠনের সদস্য। Arambai Tenggol একটি মেইতেই সশস্ত্র সংগঠন, যা ২০২৩ সাল থেকে চলমান মেইতেই-কুকি জনজাতি সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মণিপুরে বিশেষভাবে আলোচিত। এই সংগঠনকে কেন্দ্র করে এর আগেও মণিপুরে আইনশৃঙ্খলার গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মণিপুর পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত এখনও চলছে এবং মামলার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের উদ্দেশে কঠোর সতর্কবার্তা জারি করেছে।
মণিপুর সোশ্যাল মিডিয়া গ্রেফতার: আগেও একাধিক নজির
এটি মণিপুর পুলিশের প্রথম এই ধরনের গ্রেফতার নয়। রাজ্যে চলমান সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উস্কানিমূলক সোশ্যাল মিডিয়া কন্টেন্টের বিরুদ্ধে পুলিশের সক্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে মণিপুর পুলিশ ইম্ফল পূর্বের বাসিন্দা ২৫ বছরের ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটর য়ুমখাইবাম শান্তিকুমারকে গ্রেফতার করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি পথচারীদের কাছ থেকে সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে এমন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতেন যা ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব, ভুল তথ্য এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষকে উৎসাহিত করে। মণিপুর পুলিশ বলেছিল, “ক্রিয়েটরকে অনুরোধ করা হচ্ছে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে, সংবেদনশীলতাকে এড়িয়ে চলতে এবং শান্তিভঙ্গকারী বা আইনবিরুদ্ধ কোনো বিষয়বস্তু পোস্ট না করতে।”
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আবার তিনজনকে গ্রেফতার করা হয় — নিংগোম্বাম দিংকু (২২), মালেমনগানবা লাইথাংবাম (২১) এবং থোংগাম রোমেন (৩৯) — কারণ তারা “Manipur News Group 2024” নামের একটি Facebook পেজের অ্যাডমিন হিসেবে CM এন বিরেন সিং এবং তাঁর মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে হুমকিমূলক বক্তব্য অনুমোদন ও প্রকাশ করেছিলেন। আদালত তাদের পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতে রেখেছিল। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে যে মণিপুর সোশ্যাল মিডিয়া গ্রেফতার এখন সেখানে একটি নিয়মিত পদক্ষেপে পরিণত হয়েছে।
ইন্টারনেট বন্ধ থেকে IT Act: সামাজিক মাধ্যম নিয়ন্ত্রণে মণিপুরের কৌশল
সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে মণিপুর সরকার শুধু গ্রেফতারেই থামেনি — ২০২৩ সালের মে মাস থেকে শুরু হওয়া মেইতেই-কুকি সংঘাতের পর থেকে রাজ্যে বারবার ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। ২০২৫ সালের জুন মাসে ইম্ফল পশ্চিম, ইম্ফল পূর্ব, থৌবাল, কাকচিং এবং বিষ্ণুপুর — এই পাঁচটি উপত্যকা জেলায় পাঁচ দিনের জন্য ইন্টারনেট ও মোবাইল ডেটা সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই নির্দেশিকায় বলা হয়েছিল, “কিছু সমাজবিরোধী উপাদান সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে ছবি, ঘৃণার বক্তব্য এবং ঘৃণার ভিডিও বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে পারে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।”
তবে বিশেষজ্ঞরা এই পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। Manipal Global Journalism Journal-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, “বিশেষজ্ঞদের দাবি অনুযায়ী, মণিপুরে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা ভুল তথ্যের বিস্তার বন্ধ করার পরিবর্তে বরং তাকে উৎসাহিত করে — কারণ তথ্য শূন্যস্থান তৈরি হলে গুজব আরও দ্রুত ছড়ায়।” Supreme Court-ও মণিপুরের ইন্টারনেট বন্ধের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে বিচার করেছে, কারণ তথ্যের অধিকার ও বাক-স্বাধীনতাকে এই পদক্ষেপ সরাসরি প্রভাবিত করে।
আসাম ও বরাক উপত্যকার প্রাসঙ্গিকতা: সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সতর্কতা জরুরি
মণিপুর সোশ্যাল মিডিয়া গ্রেফতারের এই ঘটনা আসামের পাশাপাশি হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার নাগরিকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। মণিপুরের সাথে বরাক উপত্যকার ভৌগোলিক সান্নিধ্য এবং এই অঞ্চলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সহাবস্থানের কারণে যেকোনো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনামূলক বিষয়বস্তু এখানেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষত মণিপুর সংঘাত নিয়ে প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় অসংখ্য পোস্ট, ভিডিও ও খবর ছড়ায় — যার একটি বড় অংশ যাচাইবিহীন বা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
আসামের Information Technology (Intermediary Guidelines and Digital Media Ethics Code) Rules এবং IPC-র বিভিন্ন ধারা — বিশেষত ধারা ১৫৩(A) (সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উসকানো) এবং ৫০৫ (গণশান্তি বিঘ্নকারী বিবৃতি) — সামাজিক মাধ্যমে উস্কানিমূলক বিষয়বস্তু প্রকাশের ক্ষেত্রে আসামেও প্রযোজ্য। লালা টাউন ও হাইলাকান্দির বাসিন্দাদের তাই এখনই সচেতন হওয়া উচিত — কোনো অযাচাই করা পোস্ট শেয়ার করার আগে উৎস যাচাই করুন এবং হিংসাত্মক বা বিদ্বেষমূলক কোনো বিষয়বস্তুতে কোনোভাবে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকুন।
সামনের পথ: সতর্কতা ও আইনের ভারসাম্য
মণিপুর পুলিশ ইতিমধ্যেই সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে সামাজিক মাধ্যমে উস্কানিমূলক বা হিংসাত্মক বিষয়বস্তু পোস্ট করে যারা আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তেনসুবাম লামইয়ানবার গ্রেফতার এই বার্তাটিকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু গ্রেফতার ও ইন্টারনেট বন্ধ করে সংকটের মূল কারণ — মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ভূমি-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব — সমাধান করা যাবে না। একটি স্থায়ী শান্তির জন্য দরকার আলোচনা, পুনর্মিলনের উদ্যোগ এবং তথ্য যাচাইয়ের একটি কার্যকর পরিবেশ। মণিপুর সোশ্যাল মিডিয়া গ্রেফতারের এই ধারা বজায় থাকলে ডিজিটাল অধিকার ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নটি আগামী দিনে আরও বড় হয়ে উঠবে।