Read today's news --> ⚡️Click here 

উধারবন্দ ডায়রিয়া প্রাদুর্ভাবে শতাধিক আক্রান্ত, স্বাস্থ্য বিভাগের বিলম্বিত সাড়া প্রশ্নের মুখে

কাছাড় জেলার উধারবন্দ এলাকায় হঠাৎ দেখা দিয়েছে ডায়রিয়ার প্রকোপ। শালগঙ্গাসহ উধারবন্দ অঞ্চলের একাধিক এলাকায় শত শত মানুষ পেটের সমস্যা, বমি এবং ঘন ঘন পাতলা পায়খানার লক্ষণ নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানা গেছে। উধারবন্দ ডায়রিয়া প্রাদুর্ভাবের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই স্বাস্থ্য বিভাগের সাড়া দেওয়ার গতি এবং তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে পানীয় জলের মান নিয়ে অভিযোগ করে আসছিলেন, কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

শালগঙ্গায় ১০০-রও বেশি অসুস্থ: পরিস্থিতির বিবরণ

উধারবন্দের শালগঙ্গা এলাকায় ১০০-রও বেশি মানুষ ঢিলা পায়খানার লক্ষণ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন। পুরো উধারবন্দ অঞ্চলের হিসাব ধরলে সংখ্যাটি আরও বেশি। আক্রান্তদের বড় একটি অংশ শিশু এবং বয়স্ক মানুষ। অনেকে স্থানীয় ক্লিনিক ও CHC-তে ভিড় করছেন। বেশিরভাগ রোগীর লক্ষণ হলো তীব্র পেটব্যথা, বমি ও দুর্বলতা। যাদের অবস্থা গুরুতর তাদের সিলচার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে। কাছাড়ের যৌথ স্বাস্থ্য পরিচালক (Joint Director of Health) ডা. সুমনা নাইডিং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

কিন্তু বাসিন্দাদের অভিযোগ হলো, প্রথম রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করার পরেও স্বাস্থ্য বিভাগ যথেষ্ট দ্রুততার সঙ্গে মাঠে নামেনি। প্রতিক্রিয়ায় বিলম্ব হয়েছে কি না, নাকি রিপোর্টে কোনো তথ্যগত অসঙ্গতি রয়েছে — এই দুটি প্রশ্নই এখন কেন্দ্রে। এই বিষয়ে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে এবং উধারবন্দ ডায়রিয়া প্রাদুর্ভাবে বিলম্ব বা তথ্যবিভ্রান্তির বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে।

উধারবন্দ ডায়রিয়া প্রাদুর্ভাবের সম্ভাব্য কারণ: দূষিত পানীয় জল

কাছাড় জেলায় পানীয় জল সংক্রান্ত সমস্যা নতুন নয়। ২০১৭-১৮ সালে টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল, বরাক উপত্যকার পাথারকান্দি ও রামকৃষ্ণনগরে ভূগর্ভস্থ জলে বিপজ্জনক পরিমাণ আর্সেনিক পাওয়া গেছে। তৎকালীন PHE মন্ত্রী স্বীকার করেছিলেন যে সুষ্ঠু পরিশোধন ব্যবস্থার অভাবে গ্রামবাসীদের নিরাপদ পানীয় জল দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। ২০২৪ সালের বন্যার পরে কাছাড়ে পানীয় জলের সংকট আরও গভীর হয়েছে। SEEDS-এর মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন জানিয়েছে, কাছাড়ে বন্যার পরে নলকূপগুলো নষ্ট হয়ে যায়, জলাশয়গুলো দূষিত হয়ে পড়ে এবং আয়রনযুক্ত জল পান করে বাসিন্দাদের মধ্যে ডায়রিয়া, আমাশয় ও জন্ডিসের প্রকোপ দেখা দিয়েছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিলচারের কাটহাল রোড-পূর্ব ভাগতপুর PHE প্ল্যান্টের জল পরীক্ষায় দূষণ ধরা পড়েছিল এবং সেই জল পান অনুপযোগী ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই ঘটনার মাত্র চার মাস পরে উধারবন্দে এই প্রাদুর্ভাব বরাক উপত্যকার পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার দিকেই আঙুল তুলছে। কাছাড়ের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, ২০১৬ সালে লাখিপুর এলাকায় ডায়রিয়ায় ছয়জনের মৃত্যু হয়েছিল। সেবারও মৃত্যুর পরে স্বাস্থ্যবিভাগের দল মাঠে নেমেছিল এবং পানীয় জল পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এই পুনরাবৃত্ত প্যাটার্নটিই সবচেয়ে উদ্বেগজনক।

বরাক উপত্যকার বৃহত্তর সংকট: আগাম প্রস্তুতির অভাব

উধারবন্দ ডায়রিয়া প্রাদুর্ভাব একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরাক উপত্যকার তিনটি জেলা — কাছাড়, কামারগঞ্জ ও হাইলাকান্দি — প্রতি বছর বর্ষার আগে ও পরে জলবাহিত রোগের ঝুঁকিতে থাকে। ২০২৬ সালের মার্চে বরাক নদীর তীরে পালিত বিশ্ব জল দিবসে কাছাড়ে সরকারি সংস্থা, জনগোষ্ঠী ও প্রশাসন একসঙ্গে পানীয় জলের মান নিয়ে আলোচনা করেছিল। কিন্তু সেই আলোচনার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরে এপ্রিলেই উধারবন্দে এই প্রাদুর্ভাব প্রমাণ করে, আলোচনা থেকে মাঠে বাস্তব পদক্ষেপে পরিণত হওয়ার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।

জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের Community mobiliser দেবজ্যোতি রায় কাছাড়ের বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “সেই সময় পেটের পীড়া, চর্মরোগ এবং চুলকানির সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়েছিল।” প্রতি বছরের এই পুনরাবৃত্তির পরেও কেন স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না — সেটাই বড় প্রশ্ন।

হাইলাকান্দি লালার জন্য সতর্কসংকেত

উধারবন্দের এই প্রাদুর্ভাব হাইলাকান্দি জেলার মানুষের কাছেও সরাসরি প্রাসঙ্গিক। লালা টাউনসহ হাইলাকান্দির বহু এলাকায় পানীয় জলের মান এবং PHE সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। বর্ষার ঠিক আগের এই সময়টিতে — যখন তাপমাত্রা বাড়ছে এবং জলের স্তর কমছে — জলবাহিত রোগের ঝুঁকি সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। হাইলাকান্দি জেলায় বর্ষাপূর্ব প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসন প্রতি বছর Flood Action Plan তৈরি করে। কিন্তু বন্যার পাশাপাশি বন্যাপূর্ব ও বন্যা-পরবর্তী জলবাহিত রোগ মোকাবেলার জন্য সমান মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে কি না — সেটি পরীক্ষা করার সময় এসেছে।

লালা টাউনের বাসিন্দাদের এই মুহূর্তে কয়েকটি বিষয়ে সজাগ থাকা জরুরি। পাইপের জল ফুটিয়ে পান করা, হাত ধোওয়ার অভ্যাস নিশ্চিত করা, এবং শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে ডায়রিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া — এই পদক্ষেপগুলো জীবনরক্ষাকারী হতে পারে।

উধারবন্দ ডায়রিয়া প্রাদুর্ভাবের তদন্ত কোথায় গিয়ে পৌঁছায়, স্বাস্থ্য বিভাগ কী ব্যাখ্যা দেয় এবং দূষিত পানীয় জল সরবরাহের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না — এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কেবল উধারবন্দের বাসিন্দাদের জন্য নয়, পুরো বরাক উপত্যকার জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার পরিপক্কতার একটি পরীক্ষা। কাছাড়ের ২০১৬ সালের লাখিপুর ট্র্যাজেডির পরেও যদি একই সমস্যা ২০২৬ সালে ফিরে আসে, তাহলে ব্যর্থতাটি কেবল পরিকাঠামোর নয় — এটি সিস্টেমের।

উধারবন্দ ডায়রিয়া প্রাদুর্ভাবে শতাধিক আক্রান্ত, স্বাস্থ্য বিভাগের বিলম্বিত সাড়া প্রশ্নের মুখে
Scroll to top