২২ এপ্রিল ২০২৬। ঠিক এক বছর আগে এই দিনে জম্মু ও কাশ্মীরের পাহালগামের বৈষরান উপত্যকায় সন্ত্রাসীরা ২৬ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল — যাদের বেশিরভাগ ছিলেন পর্যটক। পাহালগাম সন্ত্রাসী হামলার প্রথম বার্ষিকীতে সারা দেশ এই ২৬ শহীদকে স্মরণ করল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লিখেছেন: “পাহালগামের নির্মম হামলায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের আমরা কখনো ভুলব না। শোকার্ত পরিবারগুলোর কথা আমার মনে আছে। জাতি হিসেবে আমরা শোক ও সংকল্পে একত্রিত। ভারত কোনো সন্ত্রাসের সামনে মাথা নত করবে না।”
বৈষরান: রক্তে ভেজা সেই উপত্যকায় আজ শহীদ স্মারক
পাহালগাম সন্ত্রাসী হামলার প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে পাহালগাম ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বৈষরান উপত্যকায় “বৈষরান শহীদ স্মারক” নির্মাণ করেছে। কালো মার্বেলে তৈরি এই স্মারকে সোনালি অক্ষরে খোদাই করা রয়েছে সমস্ত ২৬ জন শিকারের নাম। স্মারকের উপরে দুটি ভারতীয় জাতীয় পতাকা উড়ছে। লিডার নদীর তীরে তৈরি এই স্মারকে এখন পর্যটকরা আসেন শ্রদ্ধা জানাতে — যে মানুষগুলো কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে এসেছিলেন, তাঁরাই হয়ে গেছেন ইতিহাসের শহীদ।
লখনউ থেকে আসা এক পর্যটক সন্ত সিং স্মারকটি দেখে বলেছেন, “এটি একটি ভালো পদক্ষেপ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেবে সেই ভয়াবহ ঘটনাকে এবং মানুষ তাদের শ্রদ্ধা জানাতে পারবে।” নিহত ২৫ জন পর্যটকের পাশাপাশি স্মরণ করা হচ্ছে স্থানীয় ঘোড়াওয়ালা আদিল শাহকেও — যিনি সন্ত্রাসীদের অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং সেই চেষ্টায় প্রাণ দিয়েছিলেন।
পাহালগাম হামলার প্রতিক্রিয়া: অপারেশন সিন্দুর ও ভারতের সামরিক জবাব
পাহালগাম সন্ত্রাসী হামলার প্রথম বার্ষিকীর আগের রাতে ভারতীয় সেনাবাহিনী একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে। ADG PI লিখেছেন: “মানবতার সীমা অতিক্রম করলে প্রতিক্রিয়া হয় সুনির্দিষ্ট ও নিষ্পত্তিমূলক। ন্যায়বিচার হয়েছে। ভারত ঐক্যবদ্ধ। কিছু সীমা কখনো অতিক্রম করা উচিত নয়। ভারত ভোলে না।”
২৫ জন পর্যটক ও আদিল শাহের মৃত্যুর পর ভারত সরকার ৭ মে ২০২৫ রাতে ‘অপারেশন সিন্দুর’ পরিচালনা করে। এই অভিযানে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী স্থলপথ, আকাশপথ ও সমুদ্রপথে সমন্বিতভাবে পাকিস্তান ও পাকিস্তান-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে নয়টি সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে নির্ভুল আঘাত হানে। এই অভিযানে লস্কর-ই-তোইবা, জইশ-ই-মোহাম্মদ ও হিজবুল মুজাহিদিনের ১০০-এরও বেশি সন্ত্রাসী, তাদের প্রশিক্ষক ও সহযোগী নিহত হয়। পাকিস্তান পাল্টা ড্রোন হামলা ও গোলাবর্ষণ করলে ভারত লাহোর ও গুরজানওয়ালার কাছে রাডার ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানে। ১০ মে পাকিস্তানের DGMO যোগাযোগ করলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
এরপর শুরু হয় ‘অপারেশন মহাদেব’ — পাহালগামের সরাসরি হত্যাকারীদের খুঁজে বের করার মিশন। ৯৩ দিনের নিরলস তাড়ার শেষে ২৮ জুলাই ২০২৫ শ্রীনগরের উপকণ্ঠে দাচিগাম বনাঞ্চলে সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ অভিযানে হামলায় সরাসরি জড়িত তিনজন লস্কর-ই-তোইবা সন্ত্রাসীকে নিহত করা হয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং জানিয়েছেন, “অপারেশন সিন্দুর এখনও চলছে।”
আসাম ও বরাক উপত্যকার দৃষ্টিকোণ থেকে পাহালগাম হামলার অনুরণন
পাহালগাম সন্ত্রাসী হামলার প্রথম বার্ষিকীতে শুধু কাশ্মীর বা দিল্লিই নয়, গোটা ভারত শোক ও সংকল্পে একত্রিত হয়েছে — এর মধ্যে আছে আসাম ও বরাক উপত্যকার মানুষেরাও। ২২ এপ্রিল ২০২৫-এর সেই হামলায় নিহত ২৬ জনের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন বাংলা ও আসামের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাহালগামে বেড়াতে যাওয়া পর্যটক। এই তথ্যটি বরাক উপত্যকার মানুষের কাছে এই ঘটনাকে আরও ব্যক্তিগত করে তোলে।
লালা টাউনসহ হাইলাকান্দি জেলার পরিবারগুলো এই বার্ষিকীতে তাদের নিজেদের মতো করে নিহতদের স্মরণ করছে। যে পরিবারগুলো এই হামলায় স্বজন হারিয়েছেন l উড়িষ্যার নিবাসী প্রসান্ত কুমার সাতাপতির স্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে — তাদের শোক এক বছর পরেও কমেনি। সন্ত্রাসবাদ যে কোথাও হোক, সেটি ভারতের যে কোনো কোণের মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে — পাহালগামের ঘটনা এই সত্যটি আরেকবার প্রমাণ করেছে।
পাহালগাম হামলার এক বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষত এখনও তাজা — শুধু নিহতদের পরিবারের জন্য নয়, গোটা জাতির জন্য। বৈষরান স্মারকে সোনালি অক্ষরে খোদাই হওয়া ২৬টি নাম এবং সেনাবাহিনীর দৃঢ় প্রতিশ্রুতি একটি বার্তা দিচ্ছে — ভারত তার নাগরিকদের রক্তের মূল্য ভুলবে না। অপারেশন সিন্দুর ও মহাদেব একটি নতুন নীতির ঘোষণা করেছে: সীমান্তপারের সন্ত্রাসের জবাব এখন থেকে নিষ্পত্তিমূলক ও সুনির্দিষ্টভাবে দেওয়া হবে। আগামী দিনে এই নীতি ভারতের নিরাপত্তা কাঠামো ও প্রতিবেশী সম্পর্ককে কোথায় নিয়ে যায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।