Read today's news --> ⚡️Click here 

আসামে মহযুঁজ নিষিদ্ধ করল গৌহাটি হাইকোর্ট: PETA-র নতুন সাক্ষ্যে আয়োজকদের বিরুদ্ধে শাস্তির নির্দেশ

গৌহাটি হাইকোর্ট আসামের ঐতিহ্যবাহী মহিষ লড়াই — স্থানীয়ভাবে যাকে ‘মহযুঁজ’ বা ‘মহ জুঁজ’ বলা হয় — তার উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রাজ্য সরকারকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। ২১ এপ্রিল ২০২৬ প্রদত্ত এই রায়ে আদালত আসামের Home and Political Department-কে নির্দেশ দিয়েছে, রাজ্যের কোথাও যেন মহযুঁজ আয়োজন না হয় এবং যারা এই ধরনের আয়োজন করবেন তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। PETA India-র দায়ের করা একটি রিট পিটিশনের শুনানিতে আদালত এই রায় প্রদান করে। আসামে মহযুঁজ নিষিদ্ধ হওয়ার এই ঘটনা বহু বছরের আইনি লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ ও PETA-নতুন সাক্ষ্য

আদালত পরিষ্কারভাবে বলেছে, Prevention of Cruelty to Animals Act, 1960-এর আওতায় আসামে মহযুঁজ কোনোভাবেই অনুমতিযোগ্য নয়। এই আইনের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের বাঁধনকারী নজির ভাঙলে তা সরাসরি আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়বে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। PETA India জানুয়ারি ২০২৬-এ আসামের বিভিন্ন জেলায় বেআইনিভাবে অনুষ্ঠিত মহযুঁজের নতুন ও উদ্বেগজনক প্রমাণ আদালতে দাখিল করে। Deccan Herald জানিয়েছে, এই প্রমাণগুলোতে মহিষের প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠুর আচরণের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে — যা আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং এই রায়ের পথ তৈরি করে।

PETA India-র পক্ষ থেকে আদালতে উপস্থাপন করা তথ্যে দেখানো হয়, ভয়ার্ত ও গুরুতর আহত মহিষদের জোর করে লড়াইয়ে নামানো হয় — মারধর করে উত্তেজিত করে। আদালতের নির্দেশে স্পষ্ট করা হয়েছে যে মহযুঁজ আয়োজনকারীদের বিরুদ্ধে FIR দায়ের ও গ্রেফতারসহ প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।

এই বিতর্কের ইতিহাস: সংস্কৃতি বনাম আইন

আসামে মহযুঁজ নিষিদ্ধ হওয়ার এই লড়াই রাতারাতি শুরু হয়নি। এর পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘ আইনি ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের ইতিহাস। ২০১৪ সালের ৭ মে সুপ্রিম কোর্ট Animal Welfare Board of India vs. A. Nagaraja মামলায় রায় দেয় যে মহিষ লড়াই Prevention of Cruelty to Animals Act, 1960 ও Wildlife Protection Act, 1972-এর সরাসরি লঙ্ঘন। কিন্তু আসাম সরকার ২০২৩ সালে একটি SOP (Standard Operating Procedure) তৈরি করে মাঘ বিহুর সময় জানুয়ারিতে সীমিতভাবে মহযুঁজের অনুমতি দেওয়ার চেষ্টা করে। সরকারের যুক্তি ছিল, সতর্কতা অবলম্বন করলে এটি সংস্কৃতি সংরক্ষণের একটি পথ হতে পারে।

কিন্তু ডিসেম্বর ২০২৪-এ গৌহাটি হাইকোর্ট সেই SOP-টি বাতিল করে দেয়। বিচারপতি দেবাশিস বরুয়ার বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ উদ্ধৃত করা হয়েছে — আদালত বলেছিল, SOP সুপ্রিম কোর্টের ২০১৪-এর রায়ের পরিপন্থী এবং Assam সরকার তামিলনাড়ু, কর্নাটক বা মহারাষ্ট্রের মতো আইন সংশোধন না করে শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে জাতীয় আইন এড়িয়ে যেতে পারে না।

এরপর নভেম্বর ২০২৫-এ আসাম বিধানসভায় Prevention of Cruelty to Animals (Assam Amendment) Bill পাস হয় — যার লক্ষ্য ছিল মহযুঁজকে ‘নিষ্ঠুরতা’-র সংজ্ঞা থেকে বাদ দিয়ে আইনি বৈধতা দেওয়া। বিলটি বিধানসভায় সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছিল। কিন্তু জানুয়ারি ২০২৬-এ মাঘ বিহুর সময় যখন এই নতুন বিলের আওতায় আবার মহযুঁজ আয়োজন করা হয়, তখন PETA নতুন সাক্ষ্য নিয়ে আবার আদালতে যায় এবং এপ্রিলে এই রায় আসে।

আসাম সংস্কৃতি পশু কল্যাণ: দুই পক্ষের যুক্তি

মহযুঁজ আসামের অসমিয়া সমাজ ও সংস্কৃতির একটি গভীরে প্রোথিত অনুষ্ঠান। মাঘ বিহু উৎসবের সঙ্গে এটি শতাব্দীর পুরনো সম্পর্কে জড়িত। মরিগাঁও জেলার আহাতগুরি এই উৎসবের ঐতিহাসিক কেন্দ্র। অসমিয়া সমাজের একটি অংশ মনে করেন, মহযুঁজ কেবল পশু নির্যাতন নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার — দেশীয় মহিষ প্রজাতি সংরক্ষণেও এর ভূমিকা আছে। আসাম বিধানসভায় সর্বসম্মতিক্রমে বিল পাস হওয়াটা এই গণমতের শক্তির প্রমাণ।

অন্যদিকে PETA India-র যুক্তি হলো, যত যাই বলা হোক — মহিষকে লড়াইয়ে নামানো মানে তার উপর জোরপূর্বক যন্ত্রণা চাপিয়ে দেওয়া। পশুর ব্যথার কোনো সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা হয় না। Current Affairs Khanglobal-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তামিলনাড়ু ও মহারাষ্ট্র যেখানে আইন সংশোধন করে রাষ্ট্রপতির সম্মতি নিয়ে জাল্লিকাট্টু ও কম্বালার মতো ঐতিহ্যকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে, সেখানে আসামের বিধানসভা বিল পাস করলেও রাষ্ট্রপতির অনুমোদন না পেলে এটি কেন্দ্রীয় আইনের উপরে যেতে পারবে না।

হাইলাকান্দি বরাক উপত্যকায় এই রায়ের প্রাসঙ্গিকতা

মহযুঁজ মূলত ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত — বরাক উপত্যকায় এই অনুষ্ঠানের প্রচলন তুলনামূলকভাবে কম। তাই হাইলাকান্দি বা লালা টাউনে এই রায়ের সরাসরি প্রভাব সীমিত। তবে এই মামলাটি আসামের আইন, সংস্কৃতি ও পশু কল্যাণ নিয়ে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন তুলছে — যা বরাক উপত্যকার সচেতন নাগরিকদের কাছেও প্রাসঙ্গিক। বুলবুল পাখির লড়াই, যা বরাক উপত্যকার কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা যায়, সেটিও এই রায়ের আওতায় নিষিদ্ধ।

এপ্রিল ২০২৬-এর এই রায় আসামের সরকার ও সংস্কৃতির পক্ষের মানুষদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রাখছে — ঐতিহ্যকে বাঁচাতে হলে আইনের পথেই যেতে হবে, আদালতের বিরুদ্ধে নয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনসহ সংশোধিত আইনি কাঠামো তৈরি না হলে আসামে মহযুঁজ আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধই থাকবে। রাজ্য সরকার এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করবে কিনা, নাকি আইনি পথে নতুন সমাধান খুঁজবে — সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

আসামে মহযুঁজ নিষিদ্ধ করল গৌহাটি হাইকোর্ট: PETA-র নতুন সাক্ষ্যে আয়োজকদের বিরুদ্ধে শাস্তির নির্দেশ
Scroll to top