উত্তাল মণিপুরে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ একই দিনে একাধিক অভিযান পরিচালনা করেছে। ২১ এপ্রিল ২০২৬ ইম্ফল ইস্ট জেলার জাতীয় সড়ক NH-02-এর কোইরেঙেই ক্রসিংয়ে সহিংসতার অভিযোগে দুইজনকে গ্রেফতার করেছে মণিপুর পুলিশ — যাদের একজন নিজেই মণিপুর পুলিশের চাকুরিরত সদস্য। একই দিনে পৃথক অভিযানে বড় পরিমাণ অবৈধ মদ জব্দ করা হয়েছে। আর ২০ এপ্রিল তেঙনৌপাল জেলায় দুইজন সক্রিয় উগ্রপন্থীকে গ্রেফতার করা হয়েছে — যা মণিপুর পুলিশ গ্রেফতার অভিযানের একটি ব্যাপক চিত্র তুলে ধরছে।
কোইরেঙেই-তে কী ঘটেছিল: রাস্তা আটকে পাথর ও গুলতি
মণিপুর পুলিশের আনুষ্ঠানিক Facebook পেজে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, টিংরি মাখা লেইকাই নিবাসী থৌদাম গোজেন্দ্র সিং ও পুখ্রামবাম ইমো চিংলেম্বাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা কোইরেঙেই ক্রসিং এলাকায় সড়কে ধ্বংসাবশেষ জ্বালিয়ে দেন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে পাথর ও গুলতি দিয়ে আক্রমণ করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, গ্রেফতারকৃত থৌদাম গোজেন্দ্র সিং নিজে মণিপুর পুলিশের চাকুরিরত কর্মী। Impact TV মণিপুরের প্রতিবেদনেও এটি নিশ্চিত করা হয়েছে। পুলিশের নিজস্ব সদস্য বিক্ষোভ-সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় গ্রেফতার হওয়ার ঘটনাটি রাজ্যের বিদ্যমান সংকটের গভীরতাকেই প্রতিফলিত করে।
মণিপুর পুলিশ গ্রেফতারের এই সিদ্ধান্ত এসেছে এমন একটি প্রেক্ষাপটে যেখানে ইম্ফল ইস্ট জেলার কোইরেঙেই ও হাট্টা গোলপাটি, কাকচিং জেলা এবং ইম্ফল ওয়েস্টের মায়াই লাম্বিতে রাতের মশাল মিছিল চলছিল। The Week-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীরা ইম্ফল ওয়েস্টের উরিপোক, ইম্ফল ইস্টের খাবাম লামখাই ও কোইরেঙেই এবং কাকচিং টাউনে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে।
মণিপুর পুলিশ গ্রেফতার সিরিজ: মদ উদ্ধার ও এক্সাইজ বিভাগে হস্তান্তর
একই ২১ এপ্রিল, পৃথক একটি অভিযানে পুলিশ মায়াং ইম্ফল থংখং এলাকার আন্দ্রো খুনৌ লেইকাই থেকে চিংগাখাম নিলাবির সিং (২৬)-কে গ্রেফতার করে। তার কাছ থেকে প্রায় ২৭০ লিটার ও ৮০টি হাফ বোতল (আনুমানিক ৪০ লিটার) DIC অবৈধ মদ জব্দ করা হয়। গ্রেফতার ব্যক্তিকে জব্দকৃত মদসহ আরও তদন্তের জন্য Excise Department-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মণিপুরের চলমান মশাল মিছিলগুলোতে রাতের সময় মদ ও নেশাজাতীয় দ্রব্য সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে বলে পুলিশ পর্যবেক্ষণ করছে।
তেঙনৌপালে PREPAK ও PLA উগ্রপন্থী আটক: অস্ত্র ও জিজ্ঞাসাবাদ চলছে
২০ এপ্রিল তেঙনৌপাল জেলার মোরেহ থানার অন্তর্গত টি. বংমোল এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর একটি অভিযানে দুইজন তরুণ উগ্রপন্থীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মণিপুর পুলিশের X হ্যান্ডেলে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রেফতারকৃতরা হলেন সালাম ইয়াইমা মেইতেই (১৯) — যিনি নিষিদ্ধ সংগঠন PREPAK (Pro)-এর সঙ্গে যুক্ত, এবং ওয়াক্রামবাম রাহুল মেইতেই ওরফে মালেমনগানবা (১৮) — যিনি People’s Liberation Army (PLA)-র সদস্য। গ্রেফতারের পর তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে এবং বৃহত্তর নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
এই দুটি সংগঠন — PREPAK (Pro) ও PLA — মণিপুরে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। মোরেহ এলাকা মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থিত হওয়ায় এখানে উগ্রপন্থী অনুপ্রবেশের ঘটনা নতুন নয়। The North East Post-এর ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ওই মাসেও তেঙনৌপালের মোরেহ থানা এলাকায় PLA ও PREPAK-এর চারজন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার হয়েছিল। এপ্রিলের এই গ্রেফতার দেখাচ্ছে যে সীমান্তবর্তী এই এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়মিত তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
এপ্রিল ২০২৬-এর বৃহত্তর প্রেক্ষাপট: পাঁচটি মৃত্যু ও থামছে না বিক্ষোভ
মণিপুর পুলিশের এই একদিনের গ্রেফতার অভিযান বুঝতে হলে এপ্রিলের গোটা ছবিটি দেখতে হবে। এপ্রিল মাসে মণিপুরে পাঁচটি পৃথক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে — ৭ এপ্রিল বিষ্ণুপুরের ট্রংলাওবিতে বোমা হামলায় দুই শিশু, ১৮ এপ্রিল উখরুলে একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা ও একজন তাংখুল নাগা ব্যক্তি সন্দেহজনক হামলায়, এবং দ্বিতীয় সপ্তাহে মংকট চেপু গ্রামের কাছে গুলিতে একজন BSF কনস্টেবল শহীদ হন। এই কোনো মামলায়ই প্রথম দিকে গ্রেফতার না হওয়ায় বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ আরও বেড়েছে। ১৮ এপ্রিলের বিক্ষোভ মিছিলে সহিংসতার অভিযোগে ইতিমধ্যে ২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং ইম্ফল ওয়েস্টে Arambai Tenggol-এর একজন সদস্যকেও উসকানিমূলক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের জন্য গ্রেফতার করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়ি ভাঙচুর ও CRPF-এর তিনজন সদস্য গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাও এতে নথিভুক্ত হয়েছে।
মণিপুরের এই পরিস্থিতি আসাম ও বরাক উপত্যকার মানুষের কাছেও প্রাসঙ্গিক — বিশেষত যখন মণিপুরের প্রধান সরবরাহ রুট বরাক উপত্যকার ভেতর দিয়ে যায়। মণিপুরে প্রতিবার দীর্ঘ বিক্ষোভ বা সড়ক অবরোধ হলে লালা, হাইলাকান্দি ও কাছাড়ের বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহে প্রভাব পড়ে। মণিপুর পুলিশ গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রাখলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে কিনা, তার উপর নজর রাখছে সারা উত্তর-পূর্ব ভারত।
মণিপুরে আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের জন্য পুলিশি পদক্ষেপ ও NIA তদন্ত একসঙ্গে চলছে। তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গ্রেফতার ও শক্তি প্রয়োগ দিয়ে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলেও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য মেইতেই ও Kuki-Zo সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ অপরিহার্য। আপাতত, প্রতিটি নতুন গ্রেফতার ও অভিযান কেবল এটাই বলছে — মণিপুরের সংকট এখনও তার গভীরতম স্তরে বিদ্যমান।