মণিপুরের উখরুল জেলায় ফের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে কয়েকজন নিহত এবং বহু ঘরবাড়ি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ভোররাতে উখরুল জেলার মুলাম কুকি গ্রামে একটি সশস্ত্র হামলা হয়। রাত একটার দিকে গ্রামের কাছে প্রথম গুলির শব্দ শোনা যায়, এবং ভোর হওয়ার আগেই বেশ কয়েকটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং একাধিক হতাহতের খবর পাওয়া যায়। মণিপুর উখরুল সংঘর্ষের এই নতুন অধ্যায় রাজ্যের পার্বত্য এলাকায় যে অশান্তি দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকছে, তা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
হামলার বিবরণ: ভোররাতে কী ঘটেছিল
মুলাম কুকি গ্রাম কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে যেখানে বলা হয়, রাত ১টার দিকে গ্রামের কাছে ফাঁকা গুলির শব্দ শোনার পরই এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু হয়। গ্রামবাসীরা ঘুম ভেঙে আতঙ্কে ঘর ছেড়ে পালাতে শুরু করেন। এই হামলায় একাধিক ব্যক্তি আহত হন এবং কয়েকটি বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। হামলার পর সেনা ও আধাসামরিক বাহিনীর দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে।
এই হামলাটি একটি দীর্ঘ সংঘাতের সর্বশেষ পর্ব। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ উখরুলের লিতান গ্রামে তাংখুল নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র সংঘাত শুরু হয়। সেই ঘটনায় মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পঞ্চাশটিরও বেশি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। একজন তাংখুল নাগা সম্প্রদায়ের সদস্যকে মারধোরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেই অশান্তির সূচনা হয়েছিল।
ইন্টারনেট বন্ধ ও নিরাপত্তা মোতায়েন
মণিপুর সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উখরুল জেলায় পাঁচ দিনের জন্য ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ ঘোষণা করেছে। মোবাইল ডেটা এবং ব্রডব্যান্ড — উভয় পরিষেবাই স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি লিতান এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়েছে এবং CRPF, BSF এবং সেনাবাহিনীর যৌথ দল মোতায়েন করা হয়েছে।
কাতো কাটামনাও লং-এর সভাপতি মাশুংমি জিংখাই বলেছেন, “এই মুহূর্তে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা সবচেয়ে জরুরি কাজ।” শত শত গ্রামবাসী — মহিলা ও শিশু-সহ — লিতান সারেইখোং এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালিয়ে গেছেন বলে Rediff-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
সংঘাতের পটভূমি: উখরুলে কেন এত অস্থিরতা
উখরুল জেলা ঐতিহ্যগতভাবে তাংখুল নাগা সম্প্রদায়ের আধিপত্যের এলাকা। ২০২৩ সালে মেইতেই-কুকি সংঘাত শুরু হওয়ার সময় উখরুল তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল, কিন্তু নাগা জঙ্গি সংগঠন NSCN (I-M)-এর দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে উখরুলে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ চলতেই থাকে। এপ্রিল ২০২৬-এর শুরুতে এই দুই গোষ্ঠীর গোলাগুলির মধ্যে পড়ে BSF-এর বাঙালি কনস্টেবল মিঠুন মণ্ডল (৩৪) নিহত হন, যার বাড়ি ছিল পশ্চিমবঙ্গের মালদহে।
এপ্রিল মাসে দুই বেসামরিক নাগা নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তোলে। ১৮ এপ্রিল তাংখুল নাগা সম্প্রদায়ের দুজন বেসামরিক নাগরিক সন্দেহভাজন কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে অ্যাম্বুশে নিহত হন। এই মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় নাগা সংগঠনগুলো কুকিদের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে দেয়।
আসাম ও বরাক উপত্যকায় উদ্বেগ
মণিপুরের উখরুল সংঘাত আসামের জন্য সরাসরি প্রাসঙ্গিক, কারণ শিলচর-জিরিবাম-ইম্ফল সড়কপথ বরাক উপত্যকার মধ্য দিয়েই মণিপুরে প্রবেশ করে। মণিপুরে অশান্তি বাড়লে এই রুটে পণ্য সরবরাহ এবং মানুষের যাতায়াত বিঘ্নিত হয়। হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের যে ব্যবসায়ীরা মণিপুরে ব্যবসা করেন বা নিয়মিত যাতায়াত করেন, তাদের কাছে এই অস্থিরতা সরাসরি উদ্বেগের বিষয়। এছাড়া, মণিপুর থেকে বরাক উপত্যকায় পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের পরিবারও এই পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত।
বরাক উপত্যকার বহু মানুষের মণিপুরের পার্বত্য অঞ্চলে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত রয়েছেন। উখরুলে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
সামনের পথ: শান্তি ফিরবে কবে
মণিপুর উখরুল সংঘর্ষের এই পর্যায়ে কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকার উভয়েই চাপের মুখে। মণিপুরে ২০২৩ সাল থেকে যে জাতিগত সংঘাত চলছে, তার মূল সমস্যাগুলো — জমি, পার্বত্য এলাকার রাজনৈতিক অধিকার, এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিস্তার — এখনও সমাধান হয়নি। উখরুলে নাগা ও কুকি গোষ্ঠীর মধ্যে নতুন সংঘাতের পাশাপাশি নাগা সংগঠনগুলোর নিজেদের মধ্যেকার বিভাজনও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর বাড়তি উপস্থিতি এবং ইন্টারনেট বন্ধ অল্পমেয়াদে উত্তেজনা কমাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সংলাপ। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দাবি করছে, বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো যাতে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা হয় — সেই নিশ্চয়তা না দিলে উখরুলের শান্তি অধরাই থেকে যাবে।