প্রবল বর্ষণের পর শিলচর-হাফলং সড়কে ধস নেমে বরাক উপত্যকার সঙ্গে পার্বত্য জেলাগুলোর সড়ক যোগাযোগ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে পার্বত্য এলাকায় ভারী বৃষ্টির ফলে একাধিক স্থানে মাটি সরে পড়ে এবং পাথর গড়িয়ে সড়কের উপর আছড়ে পড়ে। শিলচর-হাফলং সড়কে ধস পড়ার ঘটনা এই অঞ্চলে নতুন নয়, তবে বর্ষার আগেই এপ্রিল মাসে এত তীব্র বৃষ্টিপাত এবারের পরিস্থিতিকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। হাইলাকান্দি ও লালা টাউনসহ গোটা বরাক উপত্যকার মানুষ এই খবরে সতর্ক হয়ে উঠেছেন।
ধসের বিস্তার: কোথায় কোথায় বিপদ
শিলচর থেকে হাফলংয়ের দিকে যাওয়ার পথে একাধিক বিন্দুতে ধস হয়েছে। পার্বত্য ঢাল থেকে মাটি ও পাথর সরাসরি সড়কের উপর এসে পড়ায় যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণভাবে থমকে যায়। আটকে পড়া যানবাহনের মধ্যে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক ও ব্যক্তিগত গাড়ি ছিল। চালক ও যাত্রীরা অনিশ্চিত সময়ের জন্য রাস্তায় আটকে থাকতে বাধ্য হন।
শিলচর-হাফলং মহাসড়কটি উত্তর কাছাড় পার্বত্য জেলা (দিমা হাসাও)-কে বরাক উপত্যকার সঙ্গে সংযুক্ত করে। এই সড়ক একই সঙ্গে মণিপুর ও নাগাল্যান্ডের দিকে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুটও বটে। কাজেই এই সড়ক বন্ধ হয়ে গেলে শুধু যাত্রী নয়, পণ্য সরবরাহ, ওষুধ পরিবহন এবং জরুরি সেবার উপরেও সরাসরি চাপ পড়ে।
বরাক উপত্যকায় মৌসুমি দুর্যোগ: পুনরাবৃত্ত সংকট
শিলচর-হাফলং সড়কে ধস প্রতি বছর বর্ষায় একটি নিয়মিত দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। আসাম রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (ASDMA)-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বরাক উপত্যকার তিনটি জেলা — কাছাড়, হাইলাকান্দি ও শ্রীভূমি — প্রতি বছর বন্যা ও ধসের কারণে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। বিশেষত দিমা হাসাও জেলার পার্বত্য ঢালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে তা সরাসরি শিলচর-হাফলং সড়কের উপর প্রভাব ফেলে।
ভারতের আবহাওয়া বিভাগ (IMD) এপ্রিল ২০২৬-এর শেষ সপ্তাহে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন পার্বত্য জেলায় ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছিল। পূর্বাভাসে স্পষ্ট বলা হয়েছিল যে আসাম ও মেঘালয়ের পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধস এবং বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এই পূর্বাভাসের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন সতর্ক ছিল, তবু ধস এড়ানো সম্ভব হয়নি — কারণ পার্বত্য ঢালে বৃক্ষহীনতা এবং অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা এই সংকটকে প্রতি বছর আরও তীব্র করছে।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের উপর প্রভাব
শিলচর-হাফলং সড়কে ধস সরাসরি হাইলাকান্দি জেলার মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে। হাইলাকান্দি থেকে শিলচর হয়ে হাফলং বা গুয়াহাটির দিকে যাওয়া মানুষদের একমাত্র সড়কপথ এই মহাসড়কই। লালা টাউনের ব্যবসায়ীরাও এই রুটে পণ্য আনা-নেওয়া করেন — তাজা সবজি, মাছ, ওষুধ এবং নির্মাণসামগ্রী পরিবহনের জন্য। কাজেই সড়ক বন্ধ হলে লালা টাউনের বাজারে জিনিসপত্রের সরবরাহ কমে যায় এবং দাম বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
এছাড়া, হাইলাকান্দি জেলার স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে গুরুতর রোগীদের শিলচর মেডিক্যাল কলেজে রেফার করা হয় — সড়ক বিচ্ছিন্ন হলে সেই জরুরি পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হয়। এই কারণেই শিলচর-হাফলং সড়কের সুরক্ষা এবং দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা বরাক উপত্যকার প্রতিটি জেলার মানুষের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
উদ্ধার ও মেরামত: কতক্ষণ লাগবে রাস্তা খুলতে
ধসের পরপরই আসাম সরকারের সড়ক ও সেতু বিভাগের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে মাটি ও পাথর সরানোর কাজ শুরু হয়। তবে পার্বত্য এলাকায় উদ্ধার ও মেরামতকাজ সময়সাপেক্ষ — একদিকে মাটি সরানো হচ্ছে, অন্যদিকে ঢাল থেকে নতুন মাটি সরে পড়ার আশঙ্কাও থাকে। বিশেষত বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে উদ্ধারকাজ আরও জটিল হয়ে পড়ে।
আসাম সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের হেল্পলাইন নম্বর — ১০৭০ (রাজ্য) এবং ১০৭৭ — এই সময়ে যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করা যায়। আটকে পড়া যাত্রীদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যাতে তারা ধসপ্রবণ এলাকায় অপেক্ষা না করে নিরাপদ স্থানে সরে যান এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলেন।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান: পাহাড়ে সড়ক নিরাপত্তার প্রশ্ন
শিলচর-হাফলং সড়কে ধসের সমস্যা প্রতি বছর আলোচিত হলেও কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এখনও আসেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পার্বত্য ঢালে retaining wall নির্মাণ, slope protection ব্যবস্থা এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে ধসের ক্ষতি কমানো সম্ভব। কিন্তু এই কাজে বিনিয়োগ এবং রক্ষণাবেক্ষণে ধারাবাহিকতার অভাব এই সমস্যাকে পুনরাবৃত্ত করছে।
জাতীয় মহাসড়ক কর্তৃপক্ষ (NHAI) এবং আসাম সরকারের যৌথ উদ্যোগে শিলচর-হাফলং-জিরিবাম করিডরের উন্নয়নের প্রস্তাব বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়েছে। তবে পার্বত্য ভূ-প্রকৃতিতে কাজের খরচ ও প্রযুক্তিগত জটিলতা এই প্রকল্পকে বারবার পিছিয়ে দিয়েছে। বরাক উপত্যকার মানুষের প্রত্যাশা — আসছে বর্ষার আগেই সংকটাপন্ন অংশগুলো সংস্কার করা হোক, যাতে এই রুট বন্ধ হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা আর বহন করতে না হয়।