পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার তুঙ্গে ওঠার মধ্যে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ২৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে কলকাতায় স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিয়েছেন — BJP ক্ষমতায় থাকলে CAA বাস্তবায়ন সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত করা হবে এবং বাংলাদেশি হিন্দুদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। তিনি বলেন, “প্রবাসী বাঙালিরা এসেছেন, এটা ভালো বিষয়। তবে বাংলাদেশি মুসলমানরা ভয়ের বশে ভোট দিয়েছেন।” পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু হিন্দু ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর প্রয়াসে এই বক্তব্য রাজনৈতিক দিক থেকে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
হিমন্তের প্রতিশ্রুতি: CAA বাস্তবায়ন ও ডিটেনশন ক্যাম্পে বাঙালি হিন্দু নেই
হিমন্ত বিশ্ব শর্মা কলকাতায় সাংবাদিকদের বলেন, “BJP শাসনে একজন বাংলাদেশি হিন্দুও ভীত নন। ভয়ের কোনো কারণ নেই। হিন্দুরা যদি ভারতেই নিরাপদ না থাকেন, তাহলে কোথায় থাকবেন?” একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, আসামের কোনো ডিটেনশন ক্যাম্পে বাঙালি হিন্দু নেই — এবং এই দাবি ভুল প্রমাণ করা গেলে তিনি পদত্যাগ করতেও প্রস্তুত।
CAA বাস্তবায়নের প্রশ্নে তিনি বলেন, BJP এই আইনকে “ব্যাপকভাবে” কার্যকর করবে। উল্লেখযোগ্য যে CAA অর্থাৎ Citizenship Amendment Act ২০১৯ সালে সংসদে পাশ হয় এবং ২০২৪ সালে এর বিধি জারির মাধ্যমে বাস্তবায়নের পথ খুলে যায়। এই আইন বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ বা তার আগে ভারতে প্রবেশ করা অমুসলিম শরণার্থীদের নাগরিকত্ব প্রদানের সুযোগ দেয়।
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে CAA কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনা ৪ মে ২০২৬ নির্ধারিত। CAA বাস্তবায়ন এই নির্বাচনে BJP-র একটি মূল প্রচার অস্ত্র। রাজ্যে বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু শরণার্থী পরিবারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য, এবং তাঁরা নাগরিকত্বের প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এই বক্তব্য সেই ভোটার শ্রেণীর কাছে সরাসরি পৌঁছানোর একটি প্রয়াস।
TMC-র বিরুদ্ধেও তিনি সরাসরি আক্রমণ করেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের “ডিম ও মাছ” মন্তব্যের প্রত্যুত্তরে তিনি বলেন, “আমার সঙ্গে এসে খান। আমি তাঁদের চেয়ে এক কেজি বেশি খাব।” TMC সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে তিনি বলেন, “অভিষেকজি অমিত শাহজিকে চ্যালেঞ্জ করার দরকার নেই। ৪ মে ফলাফল বেরোবে।”
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দি: CAA যাঁদের জীবন বদলে দিতে পারে
হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এই বক্তব্য শুধু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে সীমিত নয় — এর সরাসরি প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে আসামের বরাক উপত্যকায়, বিশেষত হাইলাকান্দি জেলায় এবং লালা টাউনের পাঠকদের জন্য।
Deccan Herald-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বরাক উপত্যকা — যার মধ্যে কাছাড়, হাইলাকান্দি ও শ্রীভূমি (পূর্বতন করিমগঞ্জ) অন্তর্ভুক্ত — বাঙালি-প্রধান একটি অঞ্চল এবং এখানে CAA বাস্তবায়নের দাবি বিশেষভাবে জোরালো, বিশেষত হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত আসামে মাত্র ৬ জন — যাঁদের মধ্যে ৪ জন কাছাড় জেলার — CAA-র অধীনে নাগরিকত্ব পেয়েছেন। এঁদের মধ্যে প্রথম জন হলেন কাছাড়ের ধোলাই এলাকার দেপালি দাস, যিনি ৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে নাগরিকত্বের শংসাপত্র পেয়েছেন।
হাইলাকান্দি জেলার মনাচর্রায় শরণার্থী শিবিরে থাকা পরিবারের সদস্যরাও CAA-র সুবিধার আশায় দিন গুণছেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করার জটিল প্রক্রিয়া এবং ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের মামলার চাপে অনেকে এখনো আবেদন করতে পারেননি। হিমন্তের সাম্প্রতিক বক্তব্য এই মানুষদের মনে নতুন আশার আলো জ্বালাবে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
আসামে CAA-র জটিলতা: হিমন্তের নিজস্ব অবস্থানও পরিবর্তনশীল
উল্লেখযোগ্য যে, হিমন্ত বিশ্ব শর্মা নিজেই আসামে CAA-র প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন মন্তব্য করেছেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি বলেছিলেন, “হিন্দু বাঙালিরা ১৯৭১-এর আগে থেকেই এখানে আছেন, তাই তাঁদের বিদেশি সন্দেহ করার কারণ নেই। আসামে CAA-র প্রাসঙ্গিকতা নেই।” তখন তিনি আরও জানান, প্রায় ১০ লক্ষ হিন্দু বাঙালি NRC থেকে বাদ পড়লেও তাঁদের অধিকাংশই CAA-র অধীনে আবেদন করতে রাজি নন, কারণ তাঁরা নিজেদের ১৯৭১-পূর্ব বাসিন্দা বলে দাবি করেন।
এই প্রেক্ষাপটে কলকাতায় দেওয়া তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যকে বিশ্লেষকরা নির্বাচনী কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন — পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু হিন্দু ভোটারদের আস্থা অর্জনই এর মূল লক্ষ্য। তবে CAA বাস্তবায়নের বাস্তব অগ্রগতি এখনও অত্যন্ত সীমিত। আসামের মতো সংবেদনশীল রাজ্যে, যেখানে এই আইনের বিরোধিতায় একসময় পাঁচ জন জীবন হারিয়েছিলেন, সেখানে নাগরিকত্ব প্রদানের প্রক্রিয়া আরও সময় নিতে পারে। লালা টাউন ও হাইলাকান্দির মানুষদের জন্য এই বিষয়টি নিবিড়ভাবে অনুসরণ করার দাবি রাখে।