কাছাড় জেলার সোনাই এলাকায় ২৫ এপ্রিল ২০২৬, শনিবার ভোরবেলা একটি বিশেষ অভিযানে কাছাড় পুলিশ নতুন রামনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের ৩৩ বছর বয়সী প্রাক্তন সভাপতি সাবিনা ইয়াসমিন বড়ভূইয়াকে গ্রেফতার করেছে। সোনাই মাদক উদ্ধার অভিযানে তাঁর বাড়ি থেকে ৪০টি সাবানের বাক্সের মধ্যে লুকিয়ে রাখা ৬১৫.৯৯ গ্রাম হেরোইন এবং নিষিদ্ধ সাইকোট্রপিক পদার্থ ২৯০টি নাইট্রাজেপাম ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। একই দিন তদন্তের সূত্র ধরে গুমড়া জালালপুর তারাপুর এলাকার রাজু হুসেনকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।
ভোরের অভিযান: যেভাবে ধরা পড়লেন সাবিনা ইয়াসমিন
সোনাই পুলিশ স্টেশনের অধীনে একটি বিশেষ দল নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ভোরবেলা নতুন রামনগরের গোরাকান্দি এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। সাবিনা ইয়াসমিন বড়ভূইয়ার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ ৪০টি সাবানের বাক্সের ভেতর সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা ৬১৫.৯৯ গ্রাম হেরোইন খুঁজে পায়। একইসঙ্গে ২৯০টি নাইট্রাজেপাম ট্যাবলেট জব্দ করা হয়, যা বৈধ প্রেসক্রিপশন ছাড়া রাখা বা বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া AS 11 AB 7330 নম্বরের একটি মারুতি সুজুকি গাড়িও জব্দ করা হয়েছে, কারণ পুলিশের সন্দেহ এই গাড়িটি মাদক পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হতো।
সাবিনা ইয়াসমিন বড়ভূইয়া নতুন রামনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রাক্তন নির্বাচিত সভাপতি। একজন জনপ্রতিনিধির বাড়িতে এত বড় মাদকের মজুত পাওয়া স্থানীয় মহলে তীব্র আলোড়ন তৈরি করেছে। সোনাই মাদক উদ্ধার অভিযানের এই দিকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য — কারণ গ্রাম পঞ্চায়েতের মতো তৃণমূলস্তরের সরকারি পদে থাকা বা থেকে যাওয়া ব্যক্তিদের মাদক চক্রে সম্পৃক্ততার অভিযোগ সমাজের ভরসার জায়গাগুলোকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।
পারিবারিক মাদক সংযোগ ও রাজু হুসেনের গ্রেফতার
সোনাই মাদক উদ্ধার অভিযানে শুধু সাবিনা ইয়াসমিনই নন, তদন্তের সূত্র ধরে একই দিন গুমড়া জালালপুর তারাপুর এলাকার রাজু হুসেনকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের তদন্তে জব্দ হওয়া মাদকের সঙ্গে রাজু হুসেনের যোগসূত্র পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে।
এই মামলায় আরও একটি উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, সাবিনা ইয়াসমিনের পরিবারের বিরুদ্ধে এর আগেও মাদকসংশ্লিষ্ট অভিযোগ উঠেছিল। গত বছর তাঁর স্বামী আব্দুল ওয়াজিদ বড়ভূইয়াকে মাদকদ্রব্য পরিবহন ও রাখার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। এই তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে এই পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই একটি মাদক নেটওয়ার্কের সংযোগ থাকতে পারে, যা পুলিশ এখন আরও গভীরভাবে তদন্ত করছে।
বরাক উপত্যকায় মাদক পাচার: হাইলাকান্দিও সতর্কতার দাবি রাখে
কাছাড়ের সোনাই এলাকায় এই ধারাবাহিক মাদক উদ্ধারের ঘটনা পার্শ্ববর্তী হাইলাকান্দি জেলার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কাছাড়ের সিনিয়র পুলিশ সুপার পার্থপ্রতিম দাস উল্লেখ করেছেন যে মিজোরামের চম্পাই জেলা এই পুরো অঞ্চলে মাদক সরবরাহের একটি পরিচিত ট্রানজিট পয়েন্ট। লালা টাউনসহ হাইলাকান্দির বিভিন্ন প্রান্তে মিজোরাম সীমান্ত দিয়ে আসা মাদকের অনুপ্রবেশ রোধে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বিত পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।
এই পরিস্থিতিতে পরিবারগুলোর সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সোনাই মাদক উদ্ধার অভিযানের মতো ঘটনা স্পষ্ট করে দেয় যে মাদক পাচারে জড়িত ব্যক্তিরা কখনো কখনো সমাজে পরিচিত ও প্রভাবশালী অবস্থানে থাকেন — ফলে শুধু পুলিশি অভিযানের উপর নির্ভর না করে সামাজিক সচেতনতা ও তথ্য আদান-প্রদানের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
NDPS আইনে মামলা ও আদালতে হাজিরা
গ্রেফতারকৃত সাবিনা ইয়াসমিন বড়ভূইয়া ও রাজু হুসেন উভয়কেই NDPS (Narcotic Drugs and Psychotropic Substances) Act, ১৯৮৫-এর অধীনে অভিযুক্ত করে একই দিন শনিবার আদালতে হাজির করা হয়েছে। বাণিজ্যিক পরিমাণে মাদক রাখার অভিযোগে NDPS আইনে সর্বোচ্চ ২০ বছর থেকে যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে, এবং এই ধারায় জামিন পাওয়া সাধারণত অত্যন্ত কঠিন।
পুলিশ এখন তদন্ত করছে এই মাদক চক্রটি বৃহত্তর কোনো পাচার নেটওয়ার্কের অংশ কিনা। সাবিনা ইয়াসমিনের স্বামীর বিরুদ্ধে আগের মামলার সঙ্গে এই ঘটনার সংযোগ আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জব্দ করা গাড়িটির ব্যবহারের ইতিহাস ও মাদকের সরবরাহ চেন সনাক্ত করাই এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য। এই মামলার পরবর্তী গতিপথ বরাক উপত্যকায় মাদক পাচারবিরোধী লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।