Read today's news --> ⚡️Click here 

ডিজিটাইজিং আসাম ২.০: ২৭.৬ কোটি পৃষ্ঠা অসমিয়া সাহিত্য এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে পড়া যাবে

আসামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অভূতপূর্ব ডিজিটাল সংরক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। ডিজিটাইজিং আসাম ২.০ প্রকল্পের মাধ্যমে ২৭.৬ কোটিরও বেশি পৃষ্ঠার অসমিয়া সাহিত্য, ঐতিহাসিক দলিল ও পাণ্ডুলিপি এখন ইন্টারনেটে উন্মুক্ত করা হয়েছে। ২৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে এই উদ্যোগের সাফল্য আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। এই মাইলফলক অসমিয়া ভাষা ও সংস্কৃতির বৈশ্বিক প্রসারে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কী আছে এই ডিজিটাল আর্কাইভে

ডিজিটাইজিং আসাম ২.০ প্রকল্পের অধীনে যে বিশাল ডিজিটাল ভান্ডার তৈরি হয়েছে, তাতে রয়েছে অসমিয়া ভাষার প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্যকর্ম, পুঁথিসাহিত্য, ঐতিহাসিক পত্রপত্রিকা, সরকারি দলিল, দুর্লভ পাণ্ডুলিপি এবং অসম সরকার ও সাহিত্যসভার সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ লিখিত ঐতিহ্য। এই সংখ্যা ২৭.৬ কোটি পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে গেছে, যা এককথায় অসমিয়া ভাষার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল উদ্যোগ।

এই আর্কাইভ তৈরিতে উন্নত স্ক্যানিং প্রযুক্তি, OCR (Optical Character Recognition) সফ্টওয়্যার এবং ডিজিটাল ইনডেক্সিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে ব্যবহারকারী সহজে নির্দিষ্ট শব্দ বা বিষয় অনুযায়ী তথ্য খুঁজে পান। শুধু আসামের মানুষ নন, বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে গবেষক, শিক্ষার্থী ও সাহিত্যপ্রেমীরা এই বিশাল ডিজিটাল ভান্ডার ব্যবহার করতে পারবেন। এটি অসমিয়া ভাষা ও সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার একটি কার্যকর পথ খুলে দিয়েছে।

সরকারি উদ্যোগ প্রযুক্তিগত বাস্তবায়ন

ডিজিটাইজিং আসাম ২.০ প্রকল্পটি আসাম সরকারের সংস্কৃতি বিভাগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হয়েছে। এই কার্যক্রমের অধীনে গুয়াহাটি ও ডিব্রুগড়সহ রাজ্যের প্রধান গ্রন্থাগার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাংস্কৃতিক সংস্থার সংগ্রহ থেকে উপকরণ ডিজিটাইজ করা হয়েছে। এর আগে ডিজিটাইজিং আসাম ১.০ প্রকল্পে একটি ভিত্তি তৈরি করা হয়েছিল, এবং ২.০ সংস্করণে সেই পরিধি বহুগুণ বিস্তৃত হয়েছে।

প্রকল্পের প্রযুক্তিগত দিকটি উল্লেখযোগ্য। শুধু বই স্ক্যান করাই নয়, পুরনো হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি ও জীর্ণ কাগজের নথিও ডিজিটাইজ করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শারীরিকভাবে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগেই তা ব্যবহার করতে পারে। ভারতের ডিজিটাল ইন্ডিয়া অভিযানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই প্রকল্পকে একটি মডেল হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যা অন্যান্য ভারতীয় ভাষার সাহিত্য সংরক্ষণেও অনুসরণ করা যেতে পারে।

বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী সমাজের জন্য শিক্ষণীয় দিক

ডিজিটাইজিং আসাম ২.০-এর এই সাফল্য হাইলাকান্দি জেলার লালা টাউনসহ বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী সম্প্রদায়ের জন্যও চিন্তার খোরাক জোগায়। বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষার একটি সমৃদ্ধ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে — শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে বহু দুর্লভ বাংলা পাণ্ডুলিপি, সাহিত্যকর্ম ও ঐতিহাসিক দলিল রয়েছে যেগুলো এখনো ডিজিটাইজ হয়নি। অসমিয়া ভাষার এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, সরকারি সদিচ্ছা ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ থাকলে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও একইভাবে ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা সম্ভব।

বরাক উপত্যকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গ্রন্থাগারগুলো ডিজিটাইজিং আসাম প্রকল্পের এই মডেলটি থেকে প্রেরণা নিতে পারে। বিশেষত শ্রীকৃষ্ণ স্মৃতি গ্রন্থাগারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো, যেখানে পুরনো বাংলা পত্রপত্রিকা ও গ্রন্থ সংরক্ষিত রয়েছে, সেগুলো ডিজিটাইজ করার উদ্যোগ নিলে স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে একটি নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।

ভাষা সংরক্ষণে ডিজিটাল প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ

ডিজিটাইজিং আসাম ২.০-এর সাফল্য এসেছে এমন একটি সময়ে যখন সারা বিশ্বে আঞ্চলিক ও সংখ্যালঘু ভাষা সংরক্ষণের প্রশ্নটি জরুরি হয়ে উঠেছে। ইউনেস্কো বারবার সতর্ক করেছে যে বিশ্বের বহু ভাষা আগামী কয়েক দশকে বিলুপ্তির মুখে পড়তে পারে। এই প্রেক্ষাপটে আসামের এই উদ্যোগ শুধু স্থানীয় নয়, বৈশ্বিক গুরুত্বও বহন করে।

অসমিয়া ভাষার এই ডিজিটাল আর্কাইভ একবার উন্মুক্ত হওয়ার পরে তা AI গবেষণা, ভাষাতত্ত্ব গবেষণা এবং মেশিন ট্রান্সলেশন উন্নয়নেও ব্যবহার করা যাবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এত বিপুল পরিমাণ অসমিয়া লিখিত উপকরণ ডিজিটাল রূপে পাওয়া গেলে অসমিয়া ভাষার জন্য উন্নত AI ভাষা মডেল তৈরি করা সহজ হবে, যা ভবিষ্যতে Google Translate, ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং ডিজিটাল শিক্ষা প্রযুক্তিতে কাজে আসবে।

ডিজিটাইজিং আসাম ২.০ প্রকল্পটি আসামের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ২৭.৬ কোটি পৃষ্ঠার এই বিশাল অসমিয়া সাহিত্য ভান্ডার এখন ইন্টারনেটে উন্মুক্ত হওয়ায় অসমিয়া ভাষার পাঠক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা নতুন এক সুযোগ পেলেন। একই সঙ্গে এই উদ্যোগ ভারতের অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার সাহিত্য সংরক্ষণে একটি পথ দেখিয়ে দিল। বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী সমাজও এই অনুপ্রেরণাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ভাষাগত ঐতিহ্য রক্ষায় এগিয়ে আসতে পারে — সময় এখনই।

ডিজিটাইজিং আসাম ২.০: ২৭.৬ কোটি পৃষ্ঠা অসমিয়া সাহিত্য এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে পড়া যাবে
Scroll to top