প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বুধবার কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিংয়ের লেখা একটি প্রবন্ধ তাঁর সামাজিক মাধ্যম শেয়ার করেছেন, যেখানে ভারতের জুতা শিল্পে টেকনিক্যাল টেক্সটাইলের ভূমিকা ও সম্ভাবনার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মোদি পোস্টে লিখেছেন — “মন্ত্রী গিরিরাজ সিং একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী অন্তর্দৃষ্টি তুলে ধরেছেন: জুতা শিল্পে টেকনিক্যাল টেক্সটাইল কেবল একটি উদীয়মান ধারণা নয়, এটি ইতোমধ্যেই শিল্পের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত।” এই উদ্যোগ টেকনিক্যাল টেক্সটাইল জুতা শিল্পকে জাতীয় নীতির মূল ধারায় নিয়ে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গিরিরাজ সিংয়ের প্রবন্ধে কী বলা হয়েছে
কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিং তাঁর প্রবন্ধে ভারতের জুতা শিল্পের একটি মূলগত সমস্যা চিহ্নিত করেছেন — ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জুতা উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও বৈশ্বিক রপ্তানিতে তার অংশীদারিত্ব এখনও অত্যন্ত সীমিত। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, ভারতের অধিকাংশ জুতা নির্মাতা ইতোমধ্যেই উন্নত কম্পোজিট মেটেরিয়াল, বিশেষ ফাইবার ও কার্যকরী কাপড় ব্যবহার করছেন — যা আসলে টেকনিক্যাল টেক্সটাইলের অন্তর্গত। কিন্তু এই উপকরণগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে টেকনিক্যাল টেক্সটাইল ইকোসিস্টেমের অংশ হিসেবে স্বীকৃত নয়।
আগ্রার জুতার কারখানা পরিদর্শন করে গিরিরাজ সিং সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন যে স্থানীয় নির্মাতারা জুতায় আরাম, টেকসই ভাব ও নমনীয়তা বাড়াতে উন্নত উপকরণ ব্যবহার করছেন। তবে এই উদ্ভাবনগুলো প্রায়ই অনানুষ্ঠানিক থেকে যাচ্ছে — কোনো নীতিগত স্বীকৃতি বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পাচ্ছে না। মন্ত্রীর বক্তব্য হল, এই লুকানো শক্তিকে যদি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে নীতিগত সহায়তা দেওয়া যায়, তাহলে ভারতের জুতা শিল্প রপ্তানিতে বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম।
ভারতের জুতা শিল্পের বর্তমান অবস্থান ও বিশ্ববাজারে সম্ভাবনা
২০২৫ সালে ভারতের জুতার বাজারের আকার ছিল প্রায় ২০.৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আয় বৃদ্ধি ও ভোগের ধরন পরিবর্তনের ফলে উচ্চমানের ও আরামদায়ক জুতার চাহিদা আগামী বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ভারতের সামগ্রিক টেকনিক্যাল টেক্সটাইল বাজার বর্তমানে ১৯ থেকে ২২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে রয়েছে এবং বার্ষিক ১২ থেকে ১৬ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৈশ্বিকভাবে টেকনিক্যাল টেক্সটাইলের বাজার ইতোমধ্যেই ৩২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
Confederation of Indian Footwear Industries (CIFI)-র সঙ্গে গিরিরাজ সিংয়ের এপ্রিল ৭, ২০২৬-তে হওয়া বৈঠকে শিল্পপক্ষ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে — সঠিক নীতি সহায়তা পেলে টেকনিক্যাল টেক্সটাইল জুতা শিল্পে উদ্ভাবন, মূল্য সংযোজন, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। শিল্প প্রতিনিধিরা জানান যে বর্তমানে AI-চালিত ডিজাইন, ফুট স্ক্যানিং প্রযুক্তি, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ফাইবার এবং 3D নিটিং কৌশলের মতো উন্নত প্রযুক্তি জুতার গুণমান ও উৎপাদন দক্ষতা উভয়ই বাড়াচ্ছে।
“স্মার্ট, টেকসই ও নিরবচ্ছিন্ন” বৃদ্ধির রোডম্যাপ
গিরিরাজ সিং তাঁর প্রবন্ধে জুতা শিল্পের পরবর্তী পর্যায়ের জন্য একটি “Smart, Sustainable and Seamless” রোডম্যাপ উপস্থাপন করেছেন। এই তিনটি স্তম্ভের মধ্যে রয়েছে — প্রথমত, AI-চালিত ডিজাইন ও ফুট স্ক্যানিং প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল রূপান্তর; দ্বিতীয়ত, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ফাইবার ও পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে টেকসই উৎপাদন; এবং তৃতীয়ত, 3D নিটিং ও উন্নত ম্যানুফ্যাকচারিং কৌশল ব্যবহার করে অপচয় কমানো ও দক্ষতা বাড়ানো।
প্রধানমন্ত্রী মোদি এই রোডম্যাপকে সমর্থন করে বলেছেন যে সামনের কাজ হল এই সমন্বয়কে স্বীকৃতি দেওয়া, সংগঠিত করা এবং সম্প্রসারিত করা — যাতে জুতা শিল্পকে আনুষ্ঠানিকভাবে টেকনিক্যাল টেক্সটাইল ইকোসিস্টেমের অংশ করে তোলা যায়। এই লক্ষ্যে সরকার আগামী দিনে নির্দিষ্ট নীতিমালা, প্রণোদনা ও গবেষণা-উন্নয়ন বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। ভারতের Textile Vision 2030-এর আওতায় এই খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
অসম ও বরাক উপত্যকায় টেকনিক্যাল টেক্সটাইলের সম্ভাবনা
টেকনিক্যাল টেক্সটাইল জুতা শিল্পের এই জাতীয় অগ্রগতি অসম ও বরাক উপত্যকার শিল্প ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নেও প্রাসঙ্গিক। অসম ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্পে সমৃদ্ধ — মুগা, এন্ডি ও পাট শিল্পে রাজ্যের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। টেকনিক্যাল টেক্সটাইল খাতের বিস্তার ঘটলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে নতুন মূল্য সংযোজন সম্ভব। ভারতের টেকনিক্যাল টেক্সটাইল শিল্প এখনও দেশের উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে — যেখানে উন্নত দেশে মোট টেক্সটাইলের ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ টেকনিক্যাল, সেখানে ভারতে তা মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ।
হাইলাকান্দি ও লালা শহরের ছোট বস্ত্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা যদি এই খাতে প্রশিক্ষণ ও নীতিগত সহায়তা পান, তাহলে তাঁরাও জুতার ইনসোল, জুতার আস্তর ও বিশেষ ফাইবার সরবরাহের মতো সহায়ক শিল্পে প্রবেশ করতে পারেন। কেন্দ্রীয় সরকারের National Technical Textiles Mission (NTTM) এই ধরনের উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তার সুযোগ দিচ্ছে।
কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিং ও প্রধানমন্ত্রী মোদির এই যৌথ উদ্যোগ ভারতের জুতা শিল্পের জন্য একটি নীতিগত দিকনির্দেশনার সংকেত। টেকনিক্যাল টেক্সটাইল জুতা শিল্পে ইতোমধ্যে যা অর্জিত হয়েছে তাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে নীতিগত কাঠামোতে নিয়ে আসা গেলে ভারত আগামী এক দশকে বৈশ্বিক ফুটওয়্যার রপ্তানিতে তার ন্যায্য অংশ দাবি করতে পারবে। IBEF-এর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ভারতের টেকনিক্যাল টেক্সটাইল বাজার ২০২৭ সালের মধ্যে ২৩.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করছে নীতির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন ও শিল্পের সক্রিয় অংশগ্রহণের উপর।