হাইলাকান্দি ভূমি সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আজ (১০ জুন) জেলা আবর্ত ভবনে এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজস্ব চক্রাধিকারিক এবং ভূমি ও রাজস্ব বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এই বৈঠকে শহরের বিভিন্ন জমি-সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। নাগরিকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি লাঘবে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলিকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জমি জরিপ ও নামজারি: সভায় যা আলোচিত হলো
সভায় হাইলাকান্দি শহরের জমি জরিপ সংক্রান্ত জটিলতা একটি প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। বহু বছর ধরে শহরের একাধিক মৌজায় জরিপের রেকর্ডে ত্রুটি রয়েছে বলে স্থানীয় নাগরিকদের অভিযোগ। এর ফলে নামজারি ও নাম সংশোধনের প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ দফতরে দফতরে ঘুরে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
অসম সরকারের রাজস্ব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ ইতিমধ্যে রাজ্যজুড়ে রাজস্ব চক্র কার্যালয়গুলিকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে । এই পুনর্গঠনের লক্ষ্য হলো প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রের আওতায় একটি করে উপ-জেলা গড়ে তোলা, যেখানে সমস্ত রাজস্ব-সংক্রান্ত কাজ স্থানীয়ভাবে সম্পন্ন করা যাবে। এই সংস্কারের সুফল হাইলাকান্দির মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়ার দাবি সভায় উঠে আসে।
অসম সরকারের সেওয়া সেতু পোর্টালে নাম সংশোধনের আবেদন প্রক্রিয়া সরলীকৃত করা হয়েছে এবং এই কাজ মাত্র দশ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে । তবে বাস্তবে হাইলাকান্দি শহরের অনেক নাগরিক মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও সমাধান পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। এই বিষয়টি বৈঠকে সরাসরি তুলে ধরা হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নিষ্পত্তির জন্য কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়।
পৌরসভা ও নাগরিক প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ
এই সভায় হাইলাকান্দি পৌরসভার চেয়ারম্যান শ্রী মানব চক্রবর্তী, শহর মণ্ডল সভাপতি শ্রী অমিত কুমার দেব, পৌর কমিশনারবৃন্দ এবং শহরের নাগরিক সভার প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন। পৌরসভার পক্ষ থেকে শ্রী মানব চক্রবর্তী জানান, শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে নাগরিকরা দীর্ঘদিন ধরে জমি-সংক্রান্ত নথিপত্রের ত্রুটির কারণে ব্যাংক ঋণ, উত্তরাধিকার নিষ্পত্তি ও সরকারি সুবিধা পেতে অসুবিধায় পড়ছেন।
নাগরিক সভার প্রতিনিধিরা বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করেন। তাঁদের মতে, রেকর্ড সংশোধনের জন্য নাগরিকদের বারবার গুয়াহাটি বা শিলচরে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা সময় ও অর্থ উভয়ই অপচয় করছে। জেলা স্তরেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব হওয়া উচিত বলে তাঁরা দাবি জানান। শহর মণ্ডল সভাপতি শ্রী অমিত কুমার দেব জানান, ভূমি প্রশাসনের সঙ্গে নাগরিকদের এই ধরনের সরাসরি সংলাপ অত্যন্ত ফলপ্রসূ এবং এটি নিয়মিত অনুষ্ঠিত হওয়া দরকার।
অসম জুড়ে ভূমি সংস্কারের প্রেক্ষাপট
রাজ্যব্যাপী ভূমি সংস্কারের যে ধারা চলছে, তার আলোকে হাইলাকান্দির এই উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অসম সরকার ‘মিশন বসুন্ধরা’ কর্মসূচির মাধ্যমে রাজ্যের অজরিপকৃত জমিগুলিকে আনুষ্ঠানিক রেকর্ডের আওতায় আনার চেষ্টা করছে । মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ভূমি বিক্রয়-সংক্রান্ত নতুন আইন প্রণয়নের ঘোষণাও করেছেন, যেখানে নির্বাচিত রাজস্ব চক্রে ১৯৫১ সালের আগে থেকে বসবাসকারী পরিবারের মধ্যেই জমি কেনাবেচা সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে ।
এই পরিবর্তনশীল ভূমি নীতির পরিপ্রেক্ষিতে হাইলাকান্দি শহরের নাগরিকদের জন্য রেকর্ড সংশোধন ও নামজারি নিষ্পত্তি আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। লালা টাউনসহ হাইলাকান্দি জেলার গ্রামীণ এলাকাতেও একই ধরনের ভূমি জরিপ ও নামজারি সমস্যা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, রেকর্ডে কোনো ত্রুটি থাকলে এখনই সংশ্লিষ্ট ভূমি কার্যালয়ে গিয়ে সংশোধনের আবেদন করা উচিত, কারণ ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়া আরও জটিল হতে পারে।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ ও প্রত্যাশা
আজকের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলি কার্যকর হলে হাইলাকান্দি শহরের হাজারো নাগরিক উপকৃত হবেন। ভূমি ও রাজস্ব বিভাগের কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছেন যে, শহরের মুলতুবি থাকা নামজারি ও নাম সংশোধনের আবেদনগুলি দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে এবং জরিপ-সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পৌরসভা ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, আগামী দিনেও এই ধরনের যোগাযোগ বজায় রাখা হবে এবং প্রয়োজনে আবারও বৈঠকের আয়োজন করা হবে। হাইলাকান্দি ভূমি সমস্যা সমাধানের এই উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হয়, তা আগামী কয়েক সপ্তাহেই স্পষ্ট হবে। নাগরিকরা এখন প্রশাসনের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলনের অপেক্ষায় রয়েছেন।