শুক্রবার জুমার নামাজের পর আসামের কাছাড় জেলায় ইউনিফর্ম সিভিল কোড (UCC) প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা যায়। কাছাড়ে ইউসিসি প্রতিবাদ ঘিরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন এবং বিভিন্ন এলাকায় মিছিল ও স্লোগানে সরব হন। মূলত শিলচরসহ জেলার একাধিক সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলে এই প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রস্তাবিত আইন তাঁদের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত অধিকারকে প্রভাবিত করতে পারে, তাই তা প্রত্যাহার করা উচিত।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, নামাজ শেষে মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকেই মিছিল শুরু হয় এবং পরে তা শহরের প্রধান সড়কগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে জমায়েত হলেও কোথাও কোথাও উত্তেজনার পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে জানা গেছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে।
কাছাড়ে ইউসিসি প্রতিবাদের প্রেক্ষাপট
ইউনিফর্ম সিভিল কোড নিয়ে জাতীয় স্তরে আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন রাজ্যে এর পক্ষে ও বিপক্ষে মতামত সামনে আসছে। কেন্দ্রীয় আইন কমিশন এই বিষয়ে জনমত আহ্বান করার পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়। পিটিআই এবং দ্য হিন্দু-সহ বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের বিভিন্ন সংখ্যালঘু সংগঠন এই প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
কাছাড়ে ইউসিসি প্রতিবাদ সেই বৃহত্তর জাতীয় বিতর্কেরই একটি প্রতিফলন। বিক্ষোভকারীদের একাংশের বক্তব্য, “ইউসিসি প্রয়োগ হলে ব্যক্তিগত আইন ব্যবস্থার উপর প্রভাব পড়বে, যা ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী।” স্থানীয় এক ধর্মীয় নেতার কথায়, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের মত প্রকাশ করছি। সরকার যেন সব সম্প্রদায়ের মতামত বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়।”
শুক্রবার নামাজ বিক্ষোভে জনসমাগম
শুক্রবার নামাজের পর বিক্ষোভ সংগঠিত হওয়ায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, কয়েক হাজার মানুষ এতে অংশ নেন। মিছিল চলাকালীন বিভিন্ন স্লোগান শোনা যায়, যেখানে ইউসিসি প্রস্তাবের বিরোধিতা করা হয়।
পুলিশ ও প্রশাসন আগেই পরিস্থিতি অনুমান করে প্রস্তুতি নিয়েছিল। কাছাড় জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, “আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।” যদিও কিছু এলাকায় যান চলাচলে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে।
বরাক উপত্যকা ও স্থানীয় প্রভাব
বরাক উপত্যকার সামাজিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের প্রেক্ষাপটে কাছাড়ে ইউসিসি প্রতিবাদ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জ জেলাতেও এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও সব জায়গায় বড় আকারের বিক্ষোভ হয়নি, তবুও স্থানীয় মহলে উদ্বেগ ও মতবিনিময় বাড়ছে।
লালা টাউন ও আশপাশের এলাকায়ও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ মনে করছেন, “জাতীয় নীতির প্রভাব স্থানীয় সমাজে পড়বে, তাই আগে থেকেই সচেতন হওয়া জরুরি।” আবার অন্য একটি অংশ মনে করে, বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন এই ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে শুরু করেছে। কিছু সংগঠন ইউসিসির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরলেও, সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর বড় অংশ এর বিরোধিতা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউসিসি নিয়ে আলোচনা শুধুমাত্র আইনি বিষয় নয়, এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিস্তৃত পরিসরে মতামত সংগ্রহ প্রয়োজন।
কাছাড়ে ইউসিসি প্রতিবাদ দেখিয়ে দিয়েছে যে, এই ইস্যুতে জনমত কতটা সংবেদনশীল। ভবিষ্যতে সরকার কী পদক্ষেপ নেয় এবং কীভাবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মতামতকে অন্তর্ভুক্ত করে, তার উপরই পরিস্থিতির পরবর্তী দিক নির্ভর করবে।