মিজোরামে অসম ট্রাক দুর্ঘটনায় কাছাড় জেলার দুই তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন। ২৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ভোরবেলা মিজোরামের সাইতুয়াল জেলার কেইফাং শহর সংলগ্ন এলাকায় একটি আদা বোঝাই ট্রাক পাহাড়ি রাস্তায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কয়েকশো ফুট গভীর খাদে পড়ে যায়। নিহতরা হলেন কাছাড় জেলার দক্ষিণ ধলাই থানার খুলিছড়া এলাকার বাসিন্দা চালক আকমল হুসেন লস্কর (ডাকনাম: সাহিন) এবং সহ-চালক রাহুল আলম মজুমদার। ঘটনাস্থলেই দুইজনের মৃত্যু হয় বলে স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।
দুর্ঘটনার বিবরণ: কেইফাং-এর পাহাড়ি পথে বিপর্যয়
সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনাটি ঘটেছে মিজোরামের সাইতুয়াল জেলার কেইফাং এলাকায়, যেখানে সড়কটি অত্যন্ত সরু ও বাঁকানো। আদা বোঝাই ভারী ট্রাকটি ভোররাতে এই পার্বত্য পথে চলার সময় হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কয়েকশো ফুট গভীর খাদে পড়ে যায়। স্থানীয় উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুইজনের মরদেহ উদ্ধার করে। ট্রাকটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে যায় এবং বোঝাই আদাসহ গাড়িটি খাদের তলায় ছিটকে পড়ে।
চালক আকমল হুসেন লস্কর এলাকায় “সাহিন” নামে পরিচিত ছিলেন। সহ-চালক রাহুল আলম মজুমদারও একই খুলিছড়া এলাকার বাসিন্দা — দুইজন শুধু সহকর্মীই নন, প্রতিবেশীও ছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্টগুলোয় তাদের পরিচিতজনরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। একটি পোস্টে আকমলকে “নিত্যদিনের সঙ্গী বড় ভাই” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বরাক উপত্যকার বুকে শোকের ছায়া
কাছাড় জেলার দক্ষিণ ধলাই থানার খুলিছড়া এলাকা থেকে দুই তরুণের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই গোটা বরাক উপত্যকায় শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। হাইলাকান্দি ও লালা শহরের মতো বরাক উপত্যকার প্রতিটি কোণেই এই ধরনের দুর্ঘটনার খবর গভীরভাবে অনুভূত হয়, কারণ এই অঞ্চলের বহু পরিবারের ছেলেরা জীবিকার তাগিদে মিজোরাম ও মণিপুরগামী পাহাড়ি পথে পণ্য পরিবহনের কাজ করেন। আকমল ও রাহুলের পরিবারের কাছে এই দুঃসংবাদ পৌঁছানোর পর স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে খুলিছড়া এলাকার পরিবেশ।
হাইলাকান্দি ও কাছাড় জেলার মানুষেরা জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে প্রায়ই এই বিপজ্জনক পার্বত্য পথ ব্যবহার করেন। লালা শহরসহ বরাক উপত্যকার বাজারে যে কাঁচামাল ও পণ্য আসে, তার একটি বড় অংশ মিজোরাম ও মণিপুরের পার্বত্য পথ পেরিয়ে আসে। প্রতিটি দুর্ঘটনা এই অঞ্চলের মানুষের কাছে শুধু সংখ্যার খবর নয় — একটি পরিচিত মুখের স্থায়ী অনুপস্থিতি।
পার্বত্য সড়কে নিরাপত্তা: বারবার উঠছে একই প্রশ্ন
মিজোরামের সাইতুয়াল জেলার কেইফাং এলাকার পথটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। উত্তর-পূর্ব ভারতের পার্বত্য রাজ্যগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার সমতল রাজ্যগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। Ministry of Road Transport and Highways-এর তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য সড়কে ভারী যানবাহন দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে — গার্ডরেলের অনুপস্থিতি, রাস্তার অপ্রশস্ততা, তীক্ষ্ণ বাঁক এবং রাতে বা ভোরের অন্ধকারে ভ্রমণ।
ট্রাকচালকদের সংগঠনগুলো বারবার দাবি তুলেছে যে এই পার্বত্য পথে দিনের আলোয় পরিবহনকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত এবং দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া চালকদের জন্য বিশ্রামাগার নির্মাণ করা জরুরি। পাশাপাশি, NHAI-র পক্ষ থেকে এই পথগুলো প্রশস্ত ও নিরাপদ করার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নের গতি এখনো সন্তোষজনক নয়।
আকমল হুসেন লস্কর ও রাহুল আলম মজুমদারের অকালমৃত্যু কেবল দুটি পরিবারের ক্ষতি নয় — এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের পার্বত্য সড়কগুলোয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অবহেলার একটি বেদনাদায়ক প্রতিফলন। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের উচিত এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া — যাতে জীবিকার সন্ধানে বের হওয়া প্রতিটি মানুষ নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারেন।