গুয়াহাটি সড়ক দুর্ঘটনায় তিন তরুণী নিহত হওয়ার মর্মান্তিক খবর শুধু অসমকে নয়, সারা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ২৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ভোররাত সাড়ে চারটার দিকে গুয়াহাটির মাথঘারিয়া এলাকায় একটি সুইফট ডিজায়ার গাড়ি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকে সজোরে ধাক্কা মারে। এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিন তরুণী — পুজা শাহা (২৬), আকাঙ্ক্ষা শইকীয়া (২৩) এবং নেহা খান (২১)। ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে তিনজন স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান মানহার শেঠের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে।
মাথঘারিয়ায় ভয়াবহ সংঘর্ষ: কী ঘটেছিল সেই রাতে?
গাড়িটি গীতানগর দিক থেকে আসছিল এবং গেট হাসপাতালের কাছে নুনমাটি থানা এলাকায় রাস্তার পাশে থাকা একটি পার্ক করা ট্রাকের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের প্রচণ্ডতা এতটাই বেশি ছিল যে উদ্ধারকারী দলকে ড্রিলিং মেশিন দিয়ে গাড়ির ভাঁজ কেটে মরদেহ উদ্ধার করতে হয়। দুইজন — পুজা শাহা ও আকাঙ্ক্ষা শইকীয়া — ঘটনাস্থলেই মারা যান। তৃতীয় তরুণী নেহা খানকে গাউহাটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে (GMCH) নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
CCTV ফুটেজ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুর্ঘটনাটি ঠিক ভোর ৪টা ১৯ মিনিটে ঘটে। গাড়িটি ছিল একটি ভাড়া করা পরিষেবার গাড়ি। চালক শেমিম আহমেদ এয়ারব্যাগ মোতায়েন হওয়ার কারণে বেঁচে যান, কিন্তু ঘটনার পরপরই তিনি পালিয়ে যান। গুয়াহাটির ট্রাফিক DCP জয়ন্ত সারথি বোরা জানিয়েছেন, “চালক শেমিম আহমেদ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেছেন, তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।” গাড়ির মালিককে ইতিমধ্যে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং CCTV ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তদন্ত চলছে।
তিন তরুণীর পরিচয় ও তাদের জীবনের গল্প
নিহত তিনজনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে। পুজা শাহা (২৬) গোয়ালপাড়ার মেয়ে, যিনি গুয়াহাটিতে একটি ব্যাংকে চাকরি করতেন। আকাঙ্ক্ষা শইকীয়া (২৩) ছিলেন চরাইদেও জেলার সোনারি থানার সাপেখাটি এলাকার বাসিন্দা এবং রয়্যাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির ভর্তি বিভাগে কর্মরত ছিলেন। নেহা খান (২১) ছিলেন বরপেটার মেয়ে এবং গুয়াহাটিতে পড়াশোনা করতেন। তিনজনই গুয়াহাটিতে ভাড়া বাড়িতে থাকতেন এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। সেই রাতে তারা একটি বিহু অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ফিরছিলেন।
তিনজন দুর্ঘটনার আগের সন্ধ্যায় IIT গুয়াহাটিতে কমেডিয়ান মানহার শেঠের স্ট্যান্ড-আপ শোতে উপস্থিত ছিলেন বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন। এই তথ্যটিই পরে মানহার শেঠের কাছে পৌঁছায় এবং তাঁকে গভীরভাবে মর্মাহত করে।
মানহার শেঠের শোক প্রকাশ ও কলকাতার শো উৎসর্গ
২৭ এপ্রিল, দুর্ঘটনার পরদিন, কমেডিয়ান মানহার শেঠ কলকাতায় আরেকটি লাইভ শো করছিলেন। শো শুরুর আগে তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে গুয়াহাটির দুর্ঘটনার কথা তুলে ধরেন এবং স্পষ্টতই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি জানান, খবরটি জানার পর থেকে তিনি একটি গভীর অপরাধবোধে ডুবে যান এবং বারবার নিজেকে প্রশ্ন করতে থাকেন — তারা যদি সেদিন শোতে না আসতেন, তাহলে কি দুর্ঘটনাটা এড়ানো যেত?
শেঠ জানান যে কলকাতার শো বাতিল করবেন কিনা তা নিয়ে তিনি দ্বিধায় ছিলেন, কিন্তু শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন শোটি করবেন এবং সম্পূর্ণ পরিবেশনা তিন তরুণীর স্মরণে উৎসর্গ করবেন। তিনি দর্শকদের নিরাপদ ভ্রমণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করেন এবং মানবিক সম্পর্কের মূল্যকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানান। নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করে তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
অসম ও বরাক উপত্যকার প্রতিক্রিয়া
গুয়াহাটি সড়ক দুর্ঘটনায় তিন তরুণী নিহত হওয়ার খবর অসমের সর্বত্র গভীর বেদনার জন্ম দিয়েছে। হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার মানুষের কাছে এই ঘটনা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ এই অঞ্চল থেকে বহু তরুণ-তরুণী গুয়াহাটিতে চাকরি ও পড়াশোনার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। লালা শহর ও হাইলাকান্দি জেলার পরিবারগুলো, যাদের সন্তান গুয়াহাটিতে থাকেন, তারা এই ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
রাত্রিকালীন যানবাহন চলাচলের নিরাপত্তা এবং শহুরে সড়কে পার্ক করা ভারী যানবাহনের বিপদ নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ এই ঘটনায় আবার সামনে এসেছে। অসম সরকারের উচিত দ্রুত তদন্ত শেষ করে পলাতক চালক শেমিম আহমেদকে গ্রেফতার করা এবং শহরের রাস্তায় রাতের বেলা পার্কিং বিধিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা।
পুজা শাহা, আকাঙ্ক্ষা শইকীয়া ও নেহা খানের অকালমৃত্যু পরিবারের জন্য যে শূন্যতা তৈরি করেছে, তা পূরণ হওয়ার নয়। একটি রাতের আনন্দের স্মৃতি বহন করে ফেরার পথে এই তিন তরুণী যে বিপদে পড়লেন, তা যেন আর কোনো পরিবারকে ভোগ করতে না হয় — সেই দাবি এখন গোটা অসমের।