আসামে ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করেছে ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর (IMD)। আগামী ২১ মে পর্যন্ত রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ভারী বৃষ্টি, বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড় এবং দমকা হাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ আসাম ও বরাক উপত্যকার এলাকাগুলিতে বৃষ্টির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে। ইতিমধ্যেই শিলচর, হাইলাকান্দি এবং কাছাড় জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
আইএমডি জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া আবহাওয়াজনিত পরিবর্তনের প্রভাবেই উত্তর-পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় বৃষ্টিপাত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক দিনের টানা বর্ষণে নিচু এলাকায় জল জমার পাশাপাশি ছোট নদী ও খালের জলস্তরও বাড়তে পারে। প্রশাসন সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
আসামে ভারী বৃষ্টির সতর্কতায় প্রশাসনের প্রস্তুতি
আসামে ভারী বৃষ্টির সতর্কতার পর বিভিন্ন জেলা প্রশাসন আগাম প্রস্তুতি শুরু করেছে। অসম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (ASDMA) সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতির মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনগুলিকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। বিশেষ করে ভূমিধসপ্রবণ এলাকা এবং নদী সংলগ্ন অঞ্চলে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ত্রাণ শিবির প্রস্তুত রাখা, উদ্ধারকারী দল মোতায়েন এবং জরুরি পরিষেবাগুলিকে সক্রিয় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগকেও দমকা হাওয়া ও বজ্রবিদ্যুতের সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, কিছু এলাকায় ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই ধরনের প্রবল বর্ষণ উত্তর-পূর্ব ভারতে অস্বাভাবিক নয়। তবে গত কয়েক বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির ধরনে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় শহরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা এবং গ্রামীণ এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ছে।
বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টির পূর্বাভাস ঘিরেও উদ্বেগ বাড়ছে। আবহাওয়া দপ্তর সাধারণ মানুষকে খোলা মাঠ, বড় গাছের নিচে বা বিদ্যুতের খুঁটির কাছে আশ্রয় না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। কৃষকদেরও মাঠে কাজ করার সময় অতিরিক্ত সতর্কতা মেনে চলতে বলা হয়েছে।
গত কয়েক বছরে আসামে বজ্রপাতজনিত দুর্ঘটনায় বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সেই কারণে এবার আগাম সতর্কতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। অনেক সময় বজ্রপাতের সময় মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে না যাওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকেও পরিস্থিতির দিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী ক্লাসের সময়সূচি পরিবর্তনের কথাও ভাবা হতে পারে বলে সূত্রের খবর।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দিতে বাড়ছে দুশ্চিন্তা
বরাক উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যেই টানা বৃষ্টির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। শিলচর শহরের একাধিক রাস্তায় জল জমে যান চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়েছে। হাইলাকান্দি জেলার কয়েকটি এলাকায় বাড়িঘরে জল ঢুকে পড়ার খবরও পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্বল নিকাশি ব্যবস্থার কারণে প্রতি বছর বর্ষাকালে একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
লালা টাউন এবং আশপাশের এলাকায়ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বাজার এলাকা ও ছোট রাস্তাগুলিতে জল জমার কারণে ব্যবসায়ীদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবা সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে বলেও জানা গেছে।
স্থানীয় সমাজকর্মীদের মতে, বর্ষার আগে ড্রেন পরিষ্কার এবং জল নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে আরও জোর দেওয়া দরকার ছিল। তাঁদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া প্রতি বছর একই ধরনের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি তৈরি হবে।
আগামী কয়েক দিন কী হতে পারে
আবহাওয়া দপ্তর আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আরও বাড়ে, তাহলে কিছু এলাকায় ছোটখাটো বন্যা পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। নদী সংলগ্ন এবং নিচু এলাকার বাসিন্দাদের বিশেষ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
প্রশাসন ইতিমধ্যেই জরুরি নম্বর চালু করেছে এবং স্থানীয় মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষার আগেই এই ধরনের ভারী বৃষ্টিপাত ভবিষ্যতের মৌসুমি পরিস্থিতিরও ইঙ্গিত দিতে পারে।
এখন রাজ্যের মানুষের নজর আগামী কয়েক দিনের আবহাওয়ার দিকে। টানা বৃষ্টির ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে কি না, তা নিয়েই উদ্বেগ বাড়ছে আসামের বিভিন্ন জেলায়।