মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ফের ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ভারতের জ্বালানি বাজারে। বিশেষ করে এলপিজি, পেট্রোল এবং ডিজেলের দাম বাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ হওয়ায় পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা দেশের অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও বর্তমানে ভারতে অপরিশোধিত তেলের মজুত তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে, তবুও দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে এলপিজি আমদানির ওপর ভারতের নির্ভরতা বেশি হওয়ায় রান্নার গ্যাসের দাম নিয়ে নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের তেলের দাম কেন বাড়াচ্ছে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সৌদি আরব, ইরান, ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলি আন্তর্জাতিক তেল বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর প্রভাব পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংঘাতের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই বাজারে দামের চাপ বাড়ছে। রয়টার্স এবং ব্লুমবার্গের একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা ইতিমধ্যেই তেলের দামের সম্ভাব্য বৃদ্ধির হিসাব কষতে শুরু করেছেন। এর ফলে ভবিষ্যতে ভারতীয় তেল বিপণন সংস্থাগুলির আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে শুধু জ্বালানি নয়, পরিবহণ খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও প্রভাব পড়ে। কারণ পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি পেলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ খরচ বেড়ে যায়। ফলে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সাধারণ মানুষের ওপরও পড়ে।
এলপিজি সংকট ভারত নিয়ে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
এলপিজি সংকট ভারত নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে কারণ দেশের রান্নার গ্যাসের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে গৃহস্থালির বাজেটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার ভর্তুকি বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা আর্থিক চাপও বাড়াবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের কৌশলগত তেল মজুত কিছুটা স্বস্তি দিলেও এলপিজির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা। কারণ রান্নার গ্যাসের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। গ্রামীণ এলাকায় উজ্জ্বলা প্রকল্পের মাধ্যমে এলপিজি সংযোগ বাড়ায় ব্যবহারকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
একজন জ্বালানি বিশ্লেষক বলেন, “যদি আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ভারতে এলপিজি এবং অন্যান্য জ্বালানির দামের ওপর চাপ বাড়তেই পারে।” তবে কেন্দ্রীয় সরকার এখনও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং তাৎক্ষণিক কোনও মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা করা হয়নি।
আসাম ও বরাক উপত্যকায় কী প্রভাব পড়তে পারে
আন্তর্জাতিক তেলের দাম বৃদ্ধি উত্তর-পূর্ব ভারত এবং আসামের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি পেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বরাক উপত্যকার মতো দূরবর্তী অঞ্চলে পরিবহণ খরচ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তার প্রভাব আরও দ্রুত অনুভূত হতে পারে।
হাইলাকান্দি এবং লালা টাউনের ব্যবসায়ীদের একাংশ জানিয়েছেন, জ্বালানির দাম বাড়লে পণ্য পরিবহণ ব্যয় বেড়ে যায়, যার প্রভাব সরাসরি বাজারে পড়ে। ছোট ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জন্য তখন দৈনন্দিন খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রান্নার গ্যাসের দাম বাড়লে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলির ওপর চাপ বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয় পরিবহণ ব্যবসায়ীদের মতে, ডিজেল ও পেট্রোলের দাম বাড়লে যাত্রীভাড়া এবং পণ্য পরিবহণের খরচও বাড়াতে হতে পারে। এতে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
আগামী দিনে কী হতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করবে। যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও তীব্র হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। তার প্রভাব ভারতের জ্বালানি খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়ার সম্ভাবনাও বাড়বে।
ভারত সরকার পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে বলে সূত্রের খবর। প্রয়োজনে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত মজুত ব্যবহার করে বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির চাপ এড়ানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সাধারণ মানুষের দৃষ্টি এখন আন্তর্জাতিক বাজার এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনে জ্বালানির দাম এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা বাড়বে।