টানা বর্ষণে বরাক উপত্যকায় পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। প্রবল বৃষ্টি ও ভূমিধসের জেরে শিলচর-গুয়াহাটি রেল যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে এবং একাধিক এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগজনিত ঘটনায় অন্তত একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। শিলচর, হাইলাকান্দি এবং কাছাড় জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
আবহাওয়া দপ্তর ইতিমধ্যেই দক্ষিণ আসামের বিভিন্ন জেলায় ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করেছে। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কাও বাড়ছে। রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, লামডিং-বাদরপুর পাহাড়ি রুটে ভূমিধসের কারণে মাটি ও পাথর লাইনের ওপর এসে পড়ায় ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে।
বরাক উপত্যকায় ভারী বৃষ্টিতে ব্যাহত রেল যোগাযোগ
বরাক উপত্যকায় ভারী বৃষ্টির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে রেল পরিষেবায়। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের সূত্রে জানা গেছে, পাহাড়ি এলাকায় একাধিক ভূমিধসের কারণে শিলচরের সঙ্গে গুয়াহাটির রেল যোগাযোগ আংশিকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কয়েকটি ট্রেনের সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়েছে এবং কিছু ট্রেন সাময়িকভাবে আটকে রাখা হয়েছে।
রেলওয়ে কর্মীরা দ্রুত লাইন পরিষ্কারের কাজ শুরু করলেও টানা বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সময় লাগতে পারে বলে জানানো হয়েছে। বরাক উপত্যকার মানুষের জন্য এই রেলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ খাদ্যপণ্য, জ্বালানি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বড় অংশ এই রুট দিয়েই আসে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, প্রতি বর্ষায় একইভাবে ভূমিধসের কারণে রেল যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় সমস্যা বারবার ফিরে আসছে।
ভূমিধস আসাম জুড়ে বাড়াচ্ছে উদ্বেগ
ভূমিধস আসাম জুড়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বরাক উপত্যকার সঙ্গে সংযোগকারী পাহাড়ি এলাকাগুলিতে অতিবৃষ্টির কারণে মাটি আলগা হয়ে পড়ছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে আরও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।
অসম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (ASDMA) বিভিন্ন জেলা প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। নিচু এলাকা এবং পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দাদের প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উদ্ধারকারী দল এবং জরুরি পরিষেবাগুলিকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া নিম্নচাপ এবং মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দক্ষিণ আসামে অতিবৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে নদী ও খালের জলস্তরও বাড়ছে। যদিও এখনও বড় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, তবুও প্রশাসন সম্ভাব্য ঝুঁকির দিকে নজর রাখছে।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনে দুর্ভোগ বাড়ছে
হাইলাকান্দি জেলার বহু এলাকায় জলাবদ্ধতা এবং কাদা জমে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। গ্রামীণ সড়কগুলিতে যান চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়েছে। লালা টাউন এবং আশপাশের এলাকায় বাজার ও আবাসিক এলাকায় জল জমার খবরও মিলেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, টানা বৃষ্টির কারণে বাজারে ক্রেতার সংখ্যা কমে গেছে। ছোট দোকান ও ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবাও সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
লালা টাউনের বাসিন্দাদের একাংশ অভিযোগ করেছেন, ড্রেন পরিষ্কার না হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই জল জমে যাচ্ছে। স্থানীয় সমাজকর্মীদের মতে, বর্ষার আগে নিকাশি ব্যবস্থার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
আগামী কয়েক দিন কী হতে পারে
আবহাওয়া দপ্তর আগামী কয়েক দিন দক্ষিণ আসামের বিভিন্ন জেলায় ভারী বৃষ্টি এবং বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়ের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। প্রশাসন সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার এবং প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বরাক উপত্যকার মতো পাহাড়ঘেরা অঞ্চলে অতিবৃষ্টি দ্রুত জলাবদ্ধতা ও ভূমিধসের পরিস্থিতি তৈরি করে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
এখন বরাক উপত্যকার মানুষের নজর আবহাওয়ার পরবর্তী পরিস্থিতির দিকে। যদি টানা বৃষ্টি অব্যাহত থাকে, তাহলে রেল যোগাযোগ, বাজার ব্যবস্থা এবং দৈনন্দিন জীবন আরও বেশি প্রভাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।