কাছাড় এনকাউন্টারে UKNA-যুক্ত এক কুখ্যাত মাদক পাচারকারী নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার ভোরে জিরিঘাট থানার পুলিশ দল বুমা পুঞ্জি এলাকায় অভিযান চালালে পাচারকারীরা পুলিশের উপর গুলি ছোড়ে। পুলিশের পাল্টা গুলিতে মণিপুরের তামেংলং জেলার বাসিন্দা ৪৬ বছর বয়সী সাইলেন ডাউংগাল, ওরফে দুলুং, গুরুতর আহত হন। শিলচর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (SMCH) নিয়ে গেলে সেখানে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় পুলিশের দুই সদস্য — নবজিৎ তান্তি এবং সন্তোষ বিশ্বাস — আহত হয়েছেন।
৫ মে-র হামলার জবাব — বহুদিনের অপেক্ষার সমাপ্তি
এই কাছাড় এনকাউন্টারের সরাসরি পটভূমি ছিল গত ৫ মে-র একটি ঘটনায়। সেই রাতে জয়পুর থানার অন্তর্গত ডিগলাং এলাকায় আসাম-মণিপুর আন্তঃরাজ্য সীমান্তের কাছে মাদকবিরোধী অভিযানে থাকা পুলিশ দলের উপর অতর্কিতে গুলি ছোড়ে পাচারকারীরা। হাবিলদার শরিফ হোসেন কাজি (৫৫) পেটে ও তার নিচে দুটি গুলির আঘাত পান। তাকে প্রথমে SMCH-তে ভর্তি করা হয় এবং পরের দিন উন্নত চিকিৎসার জন্য গুয়াহাটিতে এয়ারলিফট করা হয়। কাছাড়ের SSP সঞ্জীব কুমার সাইকিয়া জানান, ঘটনাটি নির্দিষ্ট গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানের সময় ঘটে। সেই ঘটনার পরেই কাছাড় পুলিশ দুই প্রধান সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করে এবং তাদের খোঁজে নিরলস অভিযান শুরু করে।
সাইলেন ডাউংগালই ছিলেন সেই দুই চিহ্নিত সন্দেহভাজনের একজন। SSP সাইকিয়া বুধবার রাতে পুলিশ তাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয় এবং বৃহস্পতিবার সকালে বুমা পুঞ্জিতে তাদের আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তারা লুকানো অস্ত্র উদ্ধারে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা পুলিশের উপর আবারও আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। জিরিঘাট পুলিশ স্টেশনের কর্মীরা পাল্টা গুলি ছুড়লে ডাউংগাল গুরুতর আহত হন।
UKNA এবং মণিপুর-আসাম সীমান্তের মাদক চক্র
সাইলেন ডাউংগাল শুধু একজন সাধারণ মাদক পাচারকারী ছিলেন না। Cachar-এর লাখিপুর কো-ডিস্ট্রিক্ট SP পৃথ্বীরাজ রাজখোয়া “ডাউংগাল ওই পাচারকারী দলের একজন সদস্য যারা গত সপ্তাহে আমাদের কর্মীদের উপর হামলা করেছিল। আমাদের রেকর্ড অনুযায়ী, তিনি মণিপুরের একটি নিষিদ্ধ সংগঠন UKNA-রও প্রাক্তন সদস্য।” United Kuki National Army (UKNA) মণিপুর-ভিত্তিক একটি নিষিদ্ধ উগ্রপন্থী সংগঠন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ৩৬ আসাম রাইফেলস মণিপুরের চুরাচাঁদপুর জেলার Songkot গ্রাম থেকে UKNA-র পাঁচজন ক্যাডারকে গ্রেফতার করে। সেই অভিযানে এম-৭৯ গ্রেনেড লঞ্চার, দুটি ৯মিমি পিস্তল, আট জোড়া জঙ্গল বুট এবং তিন কিলোগ্রাম আফিমের বীজ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে UKNA একটি উগ্রপন্থী কার্যক্রম ও মাদক পাচারের দ্বৈত নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে।
একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে মণিপুরের কুকি জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলি আসাম-মণিপুর সীমান্তের দুর্গম পার্বত্য এলাকায় পপি চাষ ও মাদক পাচারে সক্রিয়। পাচারকারীরা মণিপুর থেকে কাছাড় হয়ে মেঘালয়ের পথে গুয়াহাটিতে মাদক পাঠায়। এই রুটে জিরিঘাট একটি কৌশলগত ট্রানজিট পয়েন্ট — কারণ এটি দুর্গম অরণ্য ও আন্তঃরাজ্য সীমান্তের সংযোগস্থলে অবস্থিত।
লালা ও হাইলাকান্দির জন্য প্রাসঙ্গিকতা
হাইলাকান্দি জেলা কাছাড়ের পাশেই অবস্থিত এবং একই মাদক সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যে পড়ে। মণিপুর-মিজোরাম সীমান্ত থেকে আসা মাদকের চালান কাছাড় পেরিয়ে হাইলাকান্দি জেলায়ও ছড়িয়ে পড়ে। লালা, কাটলিছড়া ও আলগাপুরের মতো মফস্বল শহরে ইয়াবা ও হেরোইনের সহজলভ্যতা ক্রমেই একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। কাছাড়ের জিরিঘাটে উগ্রপন্থী-যুক্ত মাদক নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে পুলিশের এই এনকাউন্টার-সাফল্য তাই কার্যত বরাক উপত্যকার প্রতিটি জেলার মানুষের সুরক্ষার সঙ্গেই সংযুক্ত।
তদন্ত চলছে — বাকি অভিযুক্তদের গ্রেফতারের চেষ্টা
SP রাজখোয়া জানিয়েছেন, ৫ মে-র হামলায় পাঁচজনেরও বেশি ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন এনকাউন্টারে নিহত এবং আরেকজন পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। বাকিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। SSP সাইকিয়া বলেন, “এটি একটি আন্তঃরাজ্য চক্রের সঙ্গে যুক্ত ঘটনা এবং আমরা বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করছি।” পুলিশ মণিপুর-প্রশাসন ও গোয়েন্দা বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ডাউংগালের অতীত কার্যকলাপ এবং UKNA ও মাদক নেটওয়ার্কের সঙ্গে তার যোগাযোগের সুতো ধরে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
কাছাড় এনকাউন্টারে UKNA-যুক্ত মাদক পাচারকারীর মৃত্যু বরাক উপত্যকার মানুষের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠিয়েছে — কাছাড় পুলিশ এই লড়াইয়ে পিছু হটছে না। কিন্তু মণিপুরের পার্বত্য অঞ্চলে শিকড় বিস্তার করা এই চক্লের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল একটি জেলার পুলিশের পক্ষে জেতা সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা, মণিপুর পুলিশ, আসাম রাইফেলস এবং আসাম পুলিশের মধ্যে সমন্বিত আন্তঃরাজ্য অভিযান আরও জোরদার করা ছাড়া এই মাদক-উগ্রপন্থী দ্বৈত নেটওয়ার্কের মূলোৎপাটন সম্ভব নয়।