পবন খেরা আসাম পুলিশ ক্রাইম ব্রাঞ্চে টানা দুইদিন ধরে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়েছেন। কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র পবন খেরা বুধবার ও বৃহস্পতিবার গুয়াহাটির ক্রাইম ব্রাঞ্চ দপ্তরে হাজির হন। এরপর তাকে ২৫ মে আবার হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আসাম CM হিমন্ত বিশ্ব শর্মার স্ত্রী রিনিকি ভূঞা শর্মা কংগ্রেস নেতার বিরুদ্ধে জাল পাসপোর্ট ও বিদেশে অঘোষিত সম্পদের অভিযোগ তোলার প্রেক্ষিতে গুয়াহাটি ক্রাইম ব্রাঞ্চ পুলিশ স্টেশনে একাধিক ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেছিলেন — সেই মামলাতেই এই জিজ্ঞাসাবাদ।
টানা দশ ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদ ও দ্বিতীয় দিনের হাজিরা
বুধবার প্রথমদিন পবন খেরাকে দশ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। PTI-র বরাতে The Print জানিয়েছে, খেরা দিনের শেষে সাংবাদিকদের জানান, “আমাকে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে আবার ডাকা হয়েছে। আমি যাব। আমি পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করে আসছি এবং ভবিষ্যতেও করব।” বৃহস্পতিবার তিনি আবার হাজির হন। Economic Times জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে আগাম জামিন দেওয়ার সময় শর্ত দিয়েছিল যে তিনি আসাম পুলিশের সঙ্গে তদন্তে সহযোগিতা করবেন এবং যখনই ডাকা হবে হাজির হবেন। খেরার আইনজীবী রিতম সিং Hindustan Times-কে বলেন, “পুলিশ তাকে ১৩ মে হাজির হতে বলেছিল এবং তিনি সেই নির্দেশ মেনেছেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী খেরা ক্রাইম ব্রাঞ্চে হাজির হয়েছেন।”
অভিযোগ কী — পাসপোর্ট বিতর্ক থেকে ফৌজদারি মামলা
ঘটনার শুরু ২০২৬ সালের এপ্রিলের গোড়ায়। ৫ এপ্রিল একটি সংবাদ সম্মেলনে পবন খেরা দাবি করেন, CM হিমন্ত বিশ্ব শর্মার স্ত্রী রিনিকি ভূঞা শর্মার একাধিক পাসপোর্ট রয়েছে এবং বিদেশে তাঁর অঘোষিত সম্পদ আছে। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে রিনিকি ভূঞা শর্মা গুয়াহাটি ক্রাইম ব্রাঞ্চে খেরার বিরুদ্ধে Bharatiya Nyaya Sanhita (BNS)-এর একাধিক ধারায় ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন। অভিযোগে রয়েছে — নির্বাচন-সংক্রান্ত মিথ্যা বক্তব্য, প্রতারণা, জালিয়াতি, জাল নথি আসল বলে উপস্থাপন, শান্তিভঙ্গের উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত অপমান এবং মানহানি। Gauhati High Court অভিযোগ পর্যালোচনা করে খেরার আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয়, এই মন্তব্য করে যে মামলাটি কেবল মানহানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় — এতে জাল নথি-সংক্রান্ত গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগও রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ ও কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া
Gauhati High Court আগাম জামিন নাকচ করার পর পবন খেরা সুপ্রিম কোর্টে যান। Anandabazar Patrika জানিয়েছে, এপ্রিলের শেষে সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে আগাম জামিন মঞ্জুর করেছে — তবে শর্ত হলো তিনি আসাম পুলিশের সঙ্গে তদন্তে সহযোগিতা করবেন এবং প্রয়োজনে হাজির হবেন। খেরার আইনি দলের পক্ষে সিনিয়র অ্যাডভোকেট অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি Gauhati High Court-এ যুক্তি দিয়েছিলেন যে মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তাঁর মক্কেল ‘flight risk’ নন। তবে আদালত সেই যুক্তি গ্রহণ করেনি। অন্যদিকে কংগ্রেস নেতা রিপুন বোরা জিজ্ঞাসাবাদকে রাজ্য সরকারের ‘মানসিক হয়রানির’ প্রয়াস বলে বর্ণনা করেছেন। CM হিমন্ত শর্মা আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী খেরাকে আসাম পুলিশ স্টেশনে হাজিরা দিতে হবে।
আসামের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট — নির্বাচনের পর নতুন মোড়
এই পবন খেরা আসাম পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটছে যখন আসামে BJP-নেতৃত্বাধীন NDA মাত্র ১০২টি আসন পেয়ে বিধানসভা নির্বাচনে বিশাল জয় পেয়েছে এবং হিমন্ত বিশ্ব শর্মা দ্বিতীয় মেয়াদে CM পদে শপথ নিয়েছেন। নির্বাচনের প্রচারকালে এই পাসপোর্ট বিতর্ক এবং কংগ্রেসের অভিযোগ রাজনৈতিক পরিসরে বড় ইস্যু হয়ে উঠেছিল। ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর CM শর্মা স্পষ্টভাবে বলেছিলেন যে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে খেরাকে আসাম পুলিশের কাছে হাজিরা দিতে হবে। এই মামলাটি তাই শুধু একটি ফৌজদারি মামলা নয় — এটি আসামের বর্তমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনেরও একটি প্রতিফলন।
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার দৃষ্টিকোণ
এই মামলা হাইলাকান্দি বা লালার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত না হলেও, এর প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য। আসামের রাজনীতি প্রতিটি জেলার বাসিন্দাকে প্রভাবিত করে — এবং হাইলাকান্দির ভোটাররাও এই মে মাসে বিধানসভা নির্বাচনে মতামত দিয়েছেন। কংগ্রেসের একজন জাতীয় মুখপাত্রকে আসাম পুলিশ কর্তৃক দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করার ঘটনা বরাক উপত্যকার রাজনৈতিকভাবে সচেতন মানুষের কাছেও আলোচনার বিষয়। কংগ্রেস এটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলছে, সরকার বলছে এটি আইনি প্রক্রিয়া — এই দুটি পরস্পরবিরোধী দাবির মধ্যে বিচার বিভাগের ভূমিকাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
২৫ মে পবন খেরা তৃতীয়বারের মতো গুয়াহাটির ক্রাইম ব্রাঞ্চে হাজির হলে তদন্তের পরবর্তী দিকটি আরও স্পষ্ট হবে। তদন্তকারীরা খেরার দাবিকৃত নথিগুলির উৎস ও সত্যতা যাচাই করছেন। মামলার এই পর্যায়ে সুপ্রিম কোর্টের আগাম জামিনের মেয়াদ ও শর্ত, চলমান জিজ্ঞাসাবাদের ফলাফল এবং কংগ্রেস-সরকার দ্বন্দ্বের গতিপ্রকৃতি — সবকিছুর উপর নির্ভর করছে এই উচ্চপ্রোফাইল মামলার ভবিষ্যৎ।