পেট্রোল ডিজেল দাম বৃদ্ধির ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। শুক্রবার মধ্যরাত থেকে কার্যকর হয়েছে এই সিদ্ধান্ত — প্রতি লিটারে পেট্রোল ও ডিজেল উভয়ের দাম ৩ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। এটি গত চার বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি। দিল্লিতে পেট্রোল এখন ৯৭.৭৭ টাকা এবং ডিজেল ৯০.৬৭ টাকা প্রতি লিটার। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছানোর পরেই রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
চার বছর ধরে বোঝা বহন করেছে তেল কোম্পানিগুলো
এই পেট্রোল ডিজেল দাম বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে জমা হওয়া আর্থিক চাপ। Indian Oil Corporation, Bharat Petroleum ও Hindustan Petroleum — তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থা (OMC) মিলে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ১,০০০ কোটি টাকার লোকসান বহন করছিল। মাসিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩০,০০০ কোটি টাকা। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব সুজাতা শর্মা একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানিয়েছিলেন যে ব্যারেল প্রতি ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ৭০ ডলার থেকে বেড়ে ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তিনি আরও বলেন, ভারত তার মোট তেল আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ, LPG-র ৯০ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ৬৫ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে পায়। ফলে ওই অঞ্চলে সংঘাত ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
দাম বাড়ানোর আগে পর্যন্ত কেন্দ্র আবগারি শুল্ক কমিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ১৪,০০০ কোটি টাকার বোঝা নিজে বহন করছিল। সাবেক HPCL চেয়ারম্যান এম কে সুরানা বলেছেন, OMC-গুলির ক্রমবর্ধমান লোকসান এবং বৈশ্বিক তেলের দামের অনিশ্চয়তার কারণে জ্বালানির দাম বাড়ানো সরকারের কাছে “আর বিকল্প ছিল না” — কারণ এই অবস্থা দীর্ঘমেয়াদে OMC-গুলির আর্থিক স্থিতিশীলতাকে হুমকিতে ফেলতে পারত।
বিভিন্ন শহরে নতুন মূল্য তালিকা
New Indian Express-এর তথ্য অনুযায়ী, এই পেট্রোল ডিজেল দাম বৃদ্ধির পর দেশের প্রধান শহরে নতুন মূল্য নিম্নরূপ:
- দিল্লি: পেট্রোল ৯৭.৭৭ টাকা, ডিজেল ৯০.৬৭ টাকা
- মুম্বই: পেট্রোল ১০৬.৬৮ টাকা, ডিজেল ৯৩.১৪ টাকা
- কলকাতা: পেট্রোল ১০৮.৭৪ টাকা, ডিজেল ৯৫.১৩ টাকা
- চেন্নাই: পেট্রোল ১০৩.৬৭ টাকা, ডিজেল ৯৫.২৫ টাকা
উল্লেখ্য, এর আগে সরকার বিবেচনা করছিল প্রতি লিটারে ৪ থেকে ৫ টাকা বাড়ানোর — শেষ পর্যন্ত ৩ টাকায় রাখা হয়েছে। তুলনামূলকভাবে দেখতে গেলে, ভারতে পেট্রোলের দাম এখনও জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের তুলনায় অনেক কম — ওই দেশগুলিতে প্রতি লিটারের দাম প্রায় ২০০ টাকার কাছাকাছি।
হাইলাকান্দি ও লালায় জ্বালানি খরচের উপর প্রভাব
এই জাতীয় পেট্রোল ডিজেল দাম বৃদ্ধি হাইলাকান্দি জেলার মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও সরাসরি প্রভাব ফেলবে। ParkPlus-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৪ মে পর্যন্ত হাইলাকান্দিতে পেট্রোলের দাম ছিল ৯৬.৯১ টাকা এবং ডিজেল ৮৯.২১ টাকা প্রতি লিটার। এই বৃদ্ধির পর উভয় জ্বালানিতেই লিটারে ৩ টাকা যুক্ত হওয়ার ফলে হাইলাকান্দিতে পেট্রোল প্রায় ৯৯-১০০ টাকা এবং ডিজেল ৯২ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।
লালা ও কাটলিছড়ার মতো মফস্বল এলাকায় এর প্রভাব বহুমাত্রিক। ব্যক্তিগত গাড়ি বা দুই চাকার যানবাহনে যাতায়াতকারীদের মাসিক জ্বালানি খরচ বাড়বে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সেই মানুষেরা যারা শাকসবজি, মাছ, মাংস ও নিত্যপণ্যের জন্য শিলচর বা হাইলাকান্দি বাজারের উপর নির্ভরশীল। ডিজেলচালিত ট্রাক ও টেম্পোর পরিচালন ব্যয় বাড়লে পণ্য পরিবহনের খরচও বাড়ে — এবং সেই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্যের দামের মাধ্যমে সাধারণ ভোক্তার উপর চাপা পড়ে।
মূল্যস্ফীতির শঙ্কা ও সরকারের অবস্থান
জ্বালানির দাম বাড়লে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে তার প্রভাব পড়ে। পরিবহন খরচ বাড়ার ফলে শাকসবজি, মুদিপণ্য থেকে শুরু করে ডেলিভারি সার্ভিস পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে দাম বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একটি ছোট মূল্যবৃদ্ধি এখনই না করে পরে একসঙ্গে বড় ধাক্কা খাওয়ার চেয়ে এই পদক্ষেপ তুলনামূলকভাবে বেশি বাস্তবসম্মত। তবে কংগ্রেস সহ বিরোধী দলগুলি এই পেট্রোল ডিজেল দাম বৃদ্ধিকে “সাধারণ মানুষের উপর বোঝা চাপানো” বলে সমালোচনা করেছে।
এই দাম বৃদ্ধি ভারতের জ্বালানি নীতির একটি টার্নিং পয়েন্ট। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং অপরিশোধিত তেলের দাম উঁচুতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সাবেক পরিকল্পনা কমিশন সদস্য কিরিৎ পারিখ মনে করেন, OMC-গুলির আর্থিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সময়মতো মূল্য সমন্বয় অপরিহার্য। হাইলাকান্দি থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি কোণের সাধারণ মানুষ এখন অপেক্ষায় থাকবেন — এই মূল্যবৃদ্ধি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি আসন্ন আরও বড় বোঝার সূচনা।