NEET UG পেপার লিক কেলেঙ্কারিতে CBI-র তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের অহিল্যানগর থেকে ধনঞ্জয় লোখান্ডে এবং পুণে থেকে মনিষা ওয়াঘমারেকে গ্রেফতার করেছে। এই দুটি গ্রেফতারের ফলে মোট আটক অভিযুক্তের সংখ্যা সাতে দাঁড়িয়েছে। গত ৩ মে অনুষ্ঠিত NEET UG ২০২৬ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠার পরেই NTA পরীক্ষাটি বাতিল করে। এই একটি সিদ্ধান্তে সারা দেশের ২২ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
মহারাষ্ট্র থেকে গ্রেফতার ও বহুরাজ্যে CBI অভিযান
NEET UG পেপার লিক মামলায় CBI গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশের ১৪টি স্থানে একযোগে তল্লাশি চালিয়েছে। এর আগে তিনজনকে জয়পুর থেকে, একজনকে গুরুগ্রাম থেকে এবং একজনকে নাসিক থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। নাসিক থেকে গ্রেফতার হওয়া শুভম খৈরনার একজন BAMS ছাত্র। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, তিনি টেলিগ্রামের মাধ্যমে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র কিনে পরে হরিয়ানার একজন ক্রেতার কাছে বিক্রি করেছিলেন। তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, CBI এখন পর্যন্ত একজন কথিত ‘মাস্টারমাইন্ড’ B.Tech স্নাতক এবং দুই MBBS ছাত্রকেও গ্রেফতার করেছে যারা ‘সলভার’ হিসেবে কাজ করেছিল।
হাতে লেখা প্রশ্নপত্র থেকে PDF — প্রশ্নফাঁসের পথচিত্র
তদন্তে উঠে আসা তথ্য চাঞ্চল্যকর। NEET UG ২০২৬-এর প্রশ্নপত্র প্রথমে হাতে লিখে নেওয়া হয়েছিল। এরপর রাজস্থানে এক পরীক্ষার্থীর বাবা দিনেশ বিওয়াল সেই হাতে লেখা প্রশ্নপত্র স্ক্যান করে PDF বানিয়ে ছড়িয়ে দেন। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, প্রশ্নপত্রটি প্রথমে ইয়াশ যাদব নামে একজনের মাধ্যমে হস্তান্তরিত হয়, যিনি বিওয়ালের পরিচিত ছিলেন। রাজস্থানের সিকরে কোচিং সেন্টারে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সেই প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ে। কিছু পরীক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা এই ফাঁস হওয়া উপকরণ পেতে ২ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত দিয়েছিলেন। CBI-র FIR-এ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর আওতায় ষড়যন্ত্র, প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ এবং Public Examinations (Prevention of Unfair Means) Act, ২০২৪-এর বিধানে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
NEET কেলেঙ্কারির ধারাবাহিকতা — ২০২৪ থেকে ২০২৬
এটি ভারতের প্রথম NEET কেলেঙ্কারি নয়। ২০২৪ সালেও NEET UG পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। সেই তদন্তের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে National Medical Commission (NMC) ১৪ জন শিক্ষার্থীর ভর্তি বাতিল করে এবং ২৬ জন MBBS ছাত্রছাত্রীকে সাময়িক বরখাস্ত করে। মোট ৪২ জন পরীক্ষার্থীকে তিন বছরের জন্য NEET থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তারপরও ২০২৬ সালে ফের একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে যে পরীক্ষা পদ্ধতির কাঠামোগত সংস্কার না হলে শুধু গ্রেফতার করে সমস্যার সমাধান হবে না। NTA এরই মধ্যে জানিয়েছে, বাতিল হওয়া পরীক্ষার পরিবর্তে নতুন তারিখ ঘোষণা করা হবে।
আসাম ও বরাক উপত্যকার পরীক্ষার্থীদের উপর প্রভাব
এই NEET UG পেপার লিক কেলেঙ্কারির প্রভাব শুধু রাজস্থান বা মহারাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ নয়। আসাম থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার মেডিকেল পরীক্ষার্থী NEET-এ অংশ নেন। হাইলাকান্দি জেলার লালা, কাটলিছড়া ও শিলচরের বহু ছাত্রছাত্রী এবার ৩ মে-র পরীক্ষায় বসেছিলেন। পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তে তাদের মাসের পর মাসের পরিশ্রম ও প্রস্তুতি কার্যত মাঝপথে থমকে গেছে। পুনরায় পরীক্ষার তারিখ কবে ঘোষণা হবে, সেই অনিশ্চয়তা এই পরিবারগুলোর জন্য এক অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি করেছে। অনেক পরীক্ষার্থীই শিলচরে কোচিং করে থাকেন বা ভাড়া বাসায় থেকে প্রস্তুতি নেন — অনির্দিষ্টকালের জন্য এই খরচ বহন করা তাদের পরিবারের জন্য সহজ নয়।
সামনের পথ — তদন্ত ও ব্যবস্থার দাবি
NEET UG পেপার লিক তদন্তে CBI এখন মণি-সরবরাহের পথ ধরে মূল পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। রাজস্থানের Special Operations Group (SOG)-এর সঙ্গে সমন্বয় রেখে তদন্ত এগিয়ে চলেছে। ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ, মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস বাজেয়াপ্ত এবং সাক্ষীদের বিবৃতি রেকর্ড করে প্রমাণ সংগ্রহ চলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু গ্রেফতার যথেষ্ট নয় — পরীক্ষা পরিচালনা সংস্থা NTA-র কাঠামোগত সংস্কার, প্রশ্নপত্র মুদ্রণ ও পরিবহনে কঠোর নজরদারি এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা আমূল পরিবর্তন না হলে এই চক্র বারবার মাথা তুলবে। ভারতের প্রতিটি কোণের লক্ষ লক্ষ মেডিকেল স্বপ্নপূরণের পথ নিরাপদ করতে এই তদন্তের ফলাফল ও পরবর্তী সংস্কারের দিকে সারা দেশ তাকিয়ে আছে।