পারস্য উপসাগরের সরু পথ হরমুজ প্রণালী এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক জলপথে পরিণত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হরমুজ প্রণালী সংকটে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ভারতের মোট মাসিক অপরিশোধিত তেল আমদানির ৫০ শতাংশই এই প্রণালীর মধ্য দিয়ে আসছিল — যা আগের বছরের শেষে ছিল ৪০ শতাংশ। একটি দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ শুধু জ্বালানির দাম নয়, গোটা ভারতীয় অর্থনীতিকে টালমাটাল করতে পারে।
হরমুজ সংকট এবার দুই দিক থেকে: ইরান ও আমেরিকা
হরমুজ প্রণালী নিয়ে সংকটটি এবার একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর আগে ইরান এই প্রণালী অবরোধের হুমকি দিয়েছিল এবং কিছুটা ব্যাঘাতও ঘটিয়েছিল — তবে মার্কিন বাহিনীর কারণে পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ১৪ এপ্রিল আমেরিকা নিজে ইরান-সংযুক্ত জাহাজগুলোর চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হরমুজ প্রণালীতে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করে। ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে । ফলে একই জলপথে এখন দুটি পক্ষই বাধা তৈরি করছে — এটি ভারতের জন্য অভূতপূর্ব একটি পরিস্থিতি।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে এই কারণে যে ১১ এপ্রিল মার্কিন সরকার রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল কেনার ছাড় মেয়াদ বাড়ায়নি, ফলে রাশিয়ান তেল কেনার সুযোগও সংকুচিত হয়ে গেছে। অন্যদিকে, আমেরিকার অনুমতিতে ভারত সাত বছর পরে প্রথমবার ইরানি তেল পেয়েছে। দুটি ট্যাংকার ইতিমধ্যে ভারতীয় বন্দরে পৌঁছেছে। কিন্তু আমেরিকার নতুন হরমুজ পদক্ষেপের পর সেই সরবরাহও অনিশ্চিত হয়ে গেছে।
ভারতের জরুরি কৌশল: ৪০ দেশ থেকে তেল, বিকল্প পথ সন্ধান
হরমুজ প্রণালী সংকটে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষায় কেন্দ্র সরকার দ্রুত কৌশল পরিবর্তন করেছে। ভারত বর্তমানে ৪০টি দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল কিনছে এবং বিকল্প করিডোর ব্যবহার করে ৬০ শতাংশ তেল বিকল্প পথে আনা হচ্ছে। এটি আগের দশকের ২৭-সরবরাহকারী মডেল থেকে একটি বড় পরিবর্তন। Reuters জানিয়েছে, ভারত পরিস্থিতি সামলাতে ৬০ দিনের তেলের মজুত নিশ্চিত করেছে।
বিকল্প সরবরাহ পথের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি হলো: প্রথমত, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন, যা লোহিত সাগরের দিকে যায় এবং হরমুজ এড়িয়ে চলে। দ্বিতীয়ত, UAE-র আবুধাবি ক্রুড অয়েল পাইপলাইন, যা ফুজায়রা বন্দর পর্যন্ত যায় এবং হরমুজের বাইরে দিয়ে তেল পাঠাতে পারে। ভারতের রিফাইনারিগুলো মার্কিন, পশ্চিম আফ্রিকান এবং রাশিয়ান তেলের জন্য নতুন চুক্তি করছে। আরব সাগরে ইতিমধ্যে ৬০-১০০ মিলিয়ন ব্যারেল রুশ তেল ভাসমান অবস্থায় রয়েছে, যা তিন দিনের মধ্যে ভারতের পূর্ব উপকূলে পৌঁছানো সম্ভব।
LPG সংকট: জ্বালানি তেলের চেয়েও বড় ঝুঁকি
অপরিশোধিত তেলের চেয়েও বেশি উদ্বেগজনক হলো LPG-র পরিস্থিতি। ভারতের মোট LPG আমদানির প্রায় ১০০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে এবং প্রায় সবটাই হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে পরিবহন হয়। হরমুজ প্রণালী সংকটে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে ভঙ্গুর দিক হলো এই LPG ও Natural Gas Liquids নির্ভরতা — যার জন্য কোনো বিকল্প পথ এখনো পুরোপুরি তৈরি নেই। LNG-র ক্ষেত্রেও ভারতের ৫০ শতাংশ আমদানি হরমুজ দিয়ে আসে।
তেলের দামের প্রভাবও স্পষ্ট। তেলের দাম যদি প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলারে স্থির থাকে, তাহলে USD/INR এক্সচেঞ্জ রেট বছরের শেষে ৯৫.৫০ পর্যন্ত যেতে পারে। ভারতীয় মুদ্রার এই দুর্বলতা আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। হরমুজ সংকটের প্রভাব শুধু তেলের দামে সীমাবদ্ধ নয় — ভারতীয় রুপির মান, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতেও এর আঘাত পড়বে।
আসাম ও বরাক উপত্যকায় এই সংকটের সরাসরি প্রভাব
হরমুজ প্রণালী সংকটে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা দুর্বল হলে তার প্রভাব থেকে আসাম ও বরাক উপত্যকা মুক্ত থাকবে না। লালা টাউন, হাইলাকান্দি ও কাছাড়ের পরিবারগুলো রান্নার জন্য LPG-র উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। LPG সরবরাহে ঘাটতি বা মূল্যবৃদ্ধি মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করবে। ইতিমধ্যে ২০২৬ সালে তেলের দাম ৩৭ শতাংশ বেড়েছে বলে l
বরাক উপত্যকা ভূপরিবেষ্টিত হওয়ায় জ্বালানির পরিবহন ব্যয় এমনিতেই বেশি। জাতীয় পর্যায়ে LPG বা ডিজেলের দাম বাড়লে এই অঞ্চলে তার প্রভাব দ্বিগুণ হয়। কৃষি, পরিবহন এবং ছোট ব্যবসা — সবেতেই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি ছাপ পড়ে। লালার মতো মফস্বল শহরে, যেখানে সরকারি ভর্তুকিনির্ভর LPG সিলিন্ডারই রান্নার একমাত্র বিকল্প, সেখানে হরমুজের ভূরাজনীতির প্রতিফলন অনুভূত হতে পারে সাধারণ গৃহস্থের রান্নাঘরে। ভারত সরকার এই চাপ সামলাতে কৌশলগত তেলমজুত বাড়ানো, সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং কূটনৈতিক চ্যানেল সক্রিয় রাখার পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে হরমুজের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে ভারতকে আরও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে — বিশেষত LPG সরবরাহের বিকল্প পথ খুঁজে বের করতে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আলোচনা এবং মার্কিন-ইরান সম্পর্কের গতিপ্রকৃতিই নির্ধারণ করবে আগামী মাসগুলোতে ভারতের পেট্রোলিয়াম বাজার কোন দিকে যাবে।