আসামের HSLC পরীক্ষা ২০২৬-এর ফলাফল রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। ১০ এপ্রিল প্রকাশিত এই ফলাফলে দেখা গেছে, রাজ্যজুড়ে ৩০০-রও বেশি স্কুল — সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে — প্রায় শূন্য শতাংশ পাশের হার নথিভুক্ত করেছে। আসাম HSLC ২০২৬-এ শূন্য পাশ স্কুলের এই সংখ্যা দেখে রাজ্যের শিক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ASSEB (Assam State School Education Board) অভিভাবকদের উদ্দেশে একটি বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করেছে। পাশাপাশি, বরাক উপত্যকায় কাছাড় জেলা সমগ্র আসামের মধ্যে সর্বনিম্ন পাশের হারের জেলা হয়েছে এবং হাইলাকান্দিও রাজ্যের গড়ের অনেক নিচে রয়েছে — যা লালা টাউনসহ গোটা হাইলাকান্দির শিক্ষাঙ্গনকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।
৩০০ স্কুলে শূন্য পাশ: ব্যর্থতার পরিমাপ
এ বছর আসামে মোট ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৫ জন পরীক্ষার্থী HSLC পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে পাশ করেছেন ২ লাখ ৮১ হাজার ৭০১ জন, অর্থাৎ সামগ্রিক পাশের হার দাঁড়িয়েছে ৬৫.৬২ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় এই হার সামান্য বেশি (২০২৫ সালে ছিল ৬৩.৯৮%)। কিন্তু এই উন্নতির আড়ালে যে তথ্য লুকিয়ে আছে তা অনেক বেশি উদ্বেগজনক। ১০০-রও বেশি সরকারি স্কুলে পাশের হার ছিল প্রায় শূন্য শতাংশ। বেসরকারি স্কুলের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা আরও বেশি — ২০০-রও বেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একই দুরবস্থ l
কাছাড় জেলায় একাই ২২টি স্কুলে পাশের হার ছিল সম্পূর্ণ শূন্য, ১০টি স্কুলে পাশের হার ছিল ১০ শতাংশেরও কম এবং ২৮টি স্কুলে পাশের হার ২০ শতাংশের নিচে। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট, বরাক উপত্যকায় বিদ্যালয়-স্তরে শিক্ষার মানের ব্যবধান অত্যন্ত গভীর।
হাইলাকান্দি-কাছাড়ে আসাম HSLC ২০২৬ ফলাফল: বরাক উপত্যকার হতাশাজনক চিত্র
বরাক উপত্যকার তিনটি জেলার ফলাফল আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কাছাড় জেলা আসামের ৩৩টি জেলার মধ্যে সর্বনিম্ন স্থানে রয়েছে — মাত্র ৪৯.১৩% পাশের হারে। ২৫,৯৬১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাশ করেছেন মাত্র ১২,৭৫৫ জন। এই হার রাজ্যের গড়ের চেয়ে প্রায় ১৬ শতাংশ পয়েন্ট কম।
হাইলাকান্দি জেলার পরিসংখ্যানও গভীরভাবে উদ্বেগজনক। ১০,১৯৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাশ করেছেন ৫,২৮২ জন — অর্থাৎ হাইলাকান্দির পাশের হার ৫১.৮১%। এর মধ্যে প্রথম বিভাগে পাশ করেছেন ১,৭২২ জন, দ্বিতীয় বিভাগে ২,৯১৯ জন এবং তৃতীয় বিভাগে ৬৪১ জন। অর্থাৎ, হাইলাকান্দিতে পরীক্ষায় বসা প্রতি দুইজনের মধ্যে প্রায় একজনই এ বছর HSLC পাশ করতে পারেননি। বরাক উপত্যকার তিন জেলার মধ্যে কেবল শ্রীভূমি জেলা ৬৬.২৬% পাশের হার নিয়ে রাজ্যের গড়ের কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছে।
ASSEB-র অভিভাবক সতর্কতা ও স্কুলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ
এই পরিস্থিতিতে ASSEB দুটি পৃথক পদক্ষেপ নিয়েছে। বেসরকারি স্কুলের বিষয়ে ASSEB বোর্ডের নির্দেশিকা অনুযায়ী, পর পর তিন বছর ০ থেকে ১০ শতাংশ পাশের হারে থাকলে কোনো বেসরকারি স্কুলের অধিভুক্তি বাতিল হতে পারে। গত বছরই এই কারণে ৪৬টি বেসরকারি স্কুলের অধিভুক্তি বাতিল হয়েছিল। এ বছর নতুন করে ২০০টি দুর্বল প্রদর্শনকারী বেসরকারি স্কুলকে দুই বছরের নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
সরকারি স্কুলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ ASSEB সরাসরি সরকারি স্কুলের অধিভুক্তি বাতিল করতে পারে না। পরিবর্তে এই ফলাফল রাজ্যের শিক্ষা দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। দুর্বল ফলাফলের জন্য একাধিক সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং অনেকের বেতন আটকে রাখা হয়েছে কৈফিয়তের অপেক্ষায়।
অভিভাবকদের জন্য ASSEB পাঁচটি সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছে: এক — স্কুলের শিক্ষকদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা যাচাই করুন; দুই — স্কুলটির গত তিন-চার বছরের HSLC পাশের হার দেখুন; তিন — স্কুলটির Board অধিভুক্তি আছে কি না নিশ্চিত করুন; চার — বৈধ UDISE কোড আছে কি না পরীক্ষা করুন; পাঁচ — বিজ্ঞান ও ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য কার্যকরী ল্যাবরেটরি সুবিধা আছে কি না দেখুন।
হাইলাকান্দি ও লালার প্রেক্ষাপটে শিক্ষার সংকট
লালা টাউন ও আশপাশের অঞ্চল হাইলাকান্দি জেলার অংশ — এবং জেলার ৫১.৮১% পাশের হার লালার বিদ্যালয়গুলোকেও সরাসরি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। বরাক উপত্যকার গ্রামাঞ্চলে বেসরকারি স্কুলের দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে l এই বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে অভিভাবকদের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা যে বেসরকারি স্কুল সরকারি স্কুলের চেয়ে ভালো। কিন্তু বাস্তবে অনেক বেসরকারি স্কুল কম বেতনে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করছে এবং শিক্ষার মান বজায় রাখতে পারছে না।
সরকারি স্কুলের সমস্যাটি ভিন্ন ধরনের। একদিকে শিক্ষকদের একাংশের নিষ্ঠার অভাব, অন্যদিকে সরকারি কাজে শিক্ষকদের ঘন ঘন বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োগ করার ফলে পাঠদান থেকে বিরতি — এই দুটি সমস্যা মিলিয়ে সরকারি স্কুলের পঠন-পাঠন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
ASSEB-এর নজরদারি, show-cause নোটিশ এবং অধিভুক্তি বাতিলের হুঁশিয়ারি — এই পদক্ষেপগুলো দুর্বল স্কুলগুলোকে চাপে ফেলবে। কিন্তু যে ১ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এ বছর HSLC-তে অকৃতকার্য হয়েছেন, তাদের শিক্ষাজীবনের ক্ষতি পূরণ করার জন্য কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার জন্য প্রয়োজন বিশেষ শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি, শিক্ষক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ এবং স্কুল পর্যায়ে নিবিড় মনিটরিং। আগামী বছরের HSLC পরীক্ষার আগেই যদি এই সংস্কার শুরু না হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে l