ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের ১৪ মে ২০২৬-এ প্রকাশিত সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে পাইকারি মূল্য সূচক (WPI)-ভিত্তিক মুদ্রাস্ফীতি বার্ষিক হিসেবে ৮.৩০ শতাংশে পৌঁছেছে — যা গত ৪২ মাসে সর্বোচ্চ। মার্চ মাসে WPI মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৩.৮৮ শতাংশ, সেখান থেকে মাত্র একটি মাসে এই লাফ বিশেষজ্ঞদের অনুমানকেও ছাড়িয়ে গেছে — পূর্বাভাস ছিল ৪.৪ শতাংশ, আর বাজারের মধ্যবর্তী প্রাক্কলন ছিল ৫.৫০ শতাংশ। ভারতে WPI মুদ্রাস্ফীতি এপ্রিল ২০২৬-এর এই তীব্র বৃদ্ধির মূল কারণ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংঘাতের জেরে বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেল ও খনিজ তেলের অভূতপূর্ব দাম বৃদ্ধি।
কোন খাতে কতটা বাড়ল — তথ্যের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
বাণিজ্য মন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এপ্রিল ২০২৬-এ মুদ্রাস্ফীতির ধনাত্মক হারের মূল কারণ হল খনিজ তেল, অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস, মূল ধাতু, অন্যান্য উৎপাদিত পণ্য এবং অ-খাদ্য কৃষিপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি।” Business Standard ও Fingo News-এর তথ্যমতে, খাতওয়ারি পরিসংখ্যানটি নিম্নরূপ:
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে মুদ্রাস্ফীতি মার্চের ১.০৫ শতাংশ থেকে লাফ দিয়ে এপ্রিলে ২৪.৭১ শতাংশ হয়েছে। এই খাতের সূচক মাস-ভিত্তিতে ১৮.২২ শতাংশ বেড়েছে — মার্চের ১৫৩.৭ থেকে এপ্রিলে ১৮১.৭-এ পৌঁছেছে। এর মধ্যে খনিজ তেলের সূচক মাস-ভিত্তিতে ২৯.৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অপরিশোধিত পেট্রোলিয়ামে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি এপ্রিলে ৮৮.০৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে — মার্চে এটি ছিল ৫১.৫ শতাংশ। পেট্রোলে মুদ্রাস্ফীতি ৩২.৪ শতাংশ এবং হাই-স্পিড ডিজেলে ২৫.১৯ শতাংশ বেড়েছে।
প্রাথমিক পণ্য (Primary Articles) খাতে মুদ্রাস্ফীতি মার্চের ৬.৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯.১৭ শতাংশ হয়েছে। উৎপাদিত পণ্য (Manufactured Products)-এর মুদ্রাস্ফীতি মার্চের ৩.৩৯ শতাংশ থেকে এপ্রিলে ৪.৬২ শতাংশে উঠেছে — রাসায়নিক, বস্ত্র, যন্ত্রপাতি ও মূল ধাতুতে দাম বেড়েছে। তবে একটু স্বস্তির তথ্য হল, ডাল ও কিছু শস্যে মুদ্রাস্ফীতি নেতিবাচক — ডালে -৪.০৩ শতাংশ। WPI খাদ্য সূচকে মুদ্রাস্ফীতি মার্চের ১.৮৫ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ২.৩১ শতাংশ হয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত।
মূল চালক মধ্যপ্রাচ্য সংকট — ভারতের উৎপাদক খরচে বড় ধাক্কা
এপ্রিলের WPI মুদ্রাস্ফীতি সামগ্রিক All Commodities WPI সূচককে মার্চের ১৬০.৮ থেকে এপ্রিলে ১৬৭.০-তে নিয়ে গেছে — মাস-ভিত্তিতে ৩.৮৬ শতাংশ বৃদ্ধি। এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ মাস-ভিত্তিক বৃদ্ধি উৎপাদকের তাৎক্ষণিক খরচের চাপ দেখায় — যা পরবর্তী ১-২ মাসে খুচরা বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
মূল WPI মুদ্রাস্ফীতি (Core WPI — খাদ্য ও জ্বালানি বাদে) ৫ শতাংশে উঠেছে, যা ৪৩ মাসের সর্বোচ্চ। এই তথ্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক কারণ এটি প্রমাণ করে যে শুধু তেলের ধাক্কা নয়, অর্থনীতির বিস্তৃত উৎপাদন খাতেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ ছড়িয়ে পড়ছে। আগের মাসে মার্চ ২০২৬-এ WPI মুদ্রাস্ফীতি ৩.৮৮ শতাংশ ছিল — কিন্তু সেই সময়েই অপরিশোধিত তেলের মাস-ভিত্তিক মূল্যবৃদ্ধি ছিল ৪৯ শতাংশ, যার পূর্ণ প্রভাব এপ্রিলের WPI-তে প্রতিফলিত হয়েছে।
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকায় WPI মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব
ভারতে WPI মুদ্রাস্ফীতি এপ্রিল ২০২৬-এর এই উল্লম্ফন হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ ও কাছাড়ের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলবে? WPI হল পাইকারি স্তরের মূল্য পরিমাপ — এটি সরাসরি ভোক্তার ওপর পড়ে না, কিন্তু উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়লে পরিশেষে খুচরা দামে তার ছাপ পড়ে। লালা টাউনের বাজারে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম ইতিমধ্যে উঁচুতে আছে — পরিবহন খরচ বাড়লে সবজি, মাছ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ মূল্যও বাড়ে। পাশাপাশি, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের উৎপাদন খরচ বাড়লে আসামের কৃষিখাতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
“এই তথ্য দেখাচ্ছে যে উৎপাদক পর্যায়ের খরচ দ্রুত বাড়ছে, যদিও ভোক্তা মূল্যস্ফীতি এখনও তুলনামূলকভাবে মধ্যম। কিন্তু যদি জিনিসপত্র ও জ্বালানির দাম উঁচুতে থাকে, তাহলে ব্যবসায়ীদের মার্জিনে চাপ পড়বে।” অর্থাৎ, এখন WPI উচ্চ থাকলে আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে খুচরা বাজারেও তার প্রভাব দেখা যেতে পারে।
জুন ২০২৬-এ পরবর্তী WPI তথ্য প্রকাশিত হবে। সেই সময়ের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির উন্নতি হলে এবং বৈশ্বিক তেলের দাম কমলে WPI-ও ধীরে ধীরে নামতে পারে। তবে PTI-র তথ্যমতে, গত ছয় মাস ধরে ভারতের পাইকারি মুদ্রাস্ফীতি উর্ধ্বমুখী — এই প্রবণতা একটি কাঠামোগত চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI) ইতিমধ্যে সুদের হার নিয়ে যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেখানে WPI ও CPI-এর এই গতিপ্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি স্পষ্ট — পাম্পে তেলের দাম, বাজারে রান্নার তেল, পরিবহন ভাড়া — সবকিছুর মূল্যবৃদ্ধির গভীরে রয়েছে এই একটি সংখ্যাই: এপ্রিলের ৮.৩০ শতাংশ।